সঞ্চয়ে উত্সাহ হারাচ্ছে মানুষ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১৫

লম্বা লাইন। বড়ো এ লাইন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ভিড় বেশি থাকায় মাঝে মাঝে অফিস টাইমের পরেও অফিসে অবস্থান করতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে এমন চিত্র ছিল গত বছর পর্যন্ত।  প্রতিদিনই বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ। দিনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু গত জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে নানা কড়াকড়ি শুরু করায় বিক্রিতে ভাটা শুরু হয়েছে। গত নভেম্বরের পুরো মাসে মাত্র ৩২০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।

মানুষ তার উপার্জিত অর্থের যে অংশ সঞ্চয় করে তার বড়ো অংশই যায় সঞ্চয়পত্রে। এছাড়া ব্যাংকের আমানত হিসাবে রেখেও সঞ্চয় করে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ব্যাপক হারে কমেছে। আর গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকে আমানত রাখার প্রবণতাও অনেকাংশে কমেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ভালো না হওয়ায় ব্যাংকে তারল্যের পাহাড় জমেছিল। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংকের আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে চাচ্ছে না। আগামী এপ্রিল থেকে আমানতে মাত্র ৬ শতাংশ সুদ দিতে হবে বলে ঘোষণা করেছে সরকার। এতে ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতা আরো কমতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম, যারা টিআইএন সার্টিফিকেট করছেন না বা করতে পারছেন না তারা সঞ্চয়পত্রও কিনছেন না। ফলে মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় টাকা বিনিয়োগ করছেন, যা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। এমন অবস্থার জন্য অর্থমন্ত্রণালয় দায়ী বলে তিনি মনে করেন।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমার বিষয়ে সাবেক এ ব্যাংকার বলেন, এটির ভালো দিক এবং খারাপ দিক উভয় আছে। আগে কালো টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল। এখন সেটা কমেছে। এতে সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ সরকারকে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছিত। যা এখন অনেক কমে আসবে। অন্যদিকে খারাপ দিক হলো সরকার ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিচ্ছে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পাচ্ছে না।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে তিন হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। গত নভেম্বর মাত্র ৩২০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। একক মাস হিসেবে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই হিসাব সবচেয়ে কম। গত অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৮২২ কোটি টাকার। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। আগস্টে বিক্রি হয় ২ হাজার ২০৫ কোটি টাকার আর সেপ্টেম্বরে ৯৮৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

২০১৯-২০ অর্থবছরের সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে প্রথম পাঁচমাসে তার মাত্র ২১ শতাংশ নিয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ৮৩ শতাংশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৫ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানান কড়াকড়িতে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে শুরু করে। অর্থবছরের প্রথম দিকে কত শতাংশ কর দিতে হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। মূলত, সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা, এক লাখ টাকার ওপরে হলে ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া, অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতির কারণে একই ব্যক্তির বিভিন্ন জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ এবং অর্থের উেসর বিবরণ দেওয়ার নিয়মের কারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যায়। এছাড়া এক ব্যক্তি কত টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবে তারও সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার কারণেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। একজন ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

এদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ না পেয়ে সরকারকে ব্যাংকমুখি হতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মাত্র পাঁচ মাসেই বছরের লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেলে সরকার। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পুরো সময়ে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়েছিল ২৬ হাজার ৪৪৬  কোটি টাকা। চলতি বাজেটে সরকারের ব্যাংক ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কমিয়ে ব্যাংক ঋণ নেওয়া সরকারের জন্য ভালো বলে মনে করছেন অর্থনীতিবীদরা। তবে সরকার ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে তাও ভালো নয় বলে মনে করছেন তারা। কারণ, সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে সরকারকে গড়ে ১২ শতাংশের মতো সুদ গুনতে হয়। আর ব্যাংক ঋণে ৭ থেকে ৯ শতাংশ সুদ দিতে হয়। এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, একদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাচ্ছে অন্যদিকে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লেও সরকারের সমস্যা অন্যদিকে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলেও সেটা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। কারণ তাতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যায়।