ইউরো এখন অষ্টাদশী

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২০, ২০:২৬

এমনিতে বছরের প্রায় প্রতিটি দিনইতো ‘বিশেষ’; কোনো না কোনো বিষয় উদ্যাপনের দিবস, যেটিকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নির্ধারিত কিছু কর্মসূচি। নতুন এ বছরের একেবারে প্রথম সপ্তাটা কোটি কোটি ইউরোপীয় কাটিয়েছে ইউরোর আঠারোতম জন্মোত্সব পালন করে। তবে আরো নিখুঁতভাবে বলার প্রসঙ্গ আসলে বলতে হয়, আঠারো নয়, অভিন্ন মুদ্রা রূপে উনিশটি দেশকে সংযুক্ত করা ইউরো একুশ বছর পূর্ণ করেছে। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ধাতবমুদ্রা ও ব্যাংকনোট হিসেবে ইউরো প্রথমে প্রতিস্থাপন করেছিল ১২টি জাতীয় মুদ্রাকে। সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘ইতিহাসের সর্ববৃহত্ অর্থ অবস্থান্তর’। কিন্তু কার্যত এই মুদ্রাটির যাত্রা সূচিত হয়েছিল ১৯৯৯-র ৫ জানুয়ারি। তখন থেকেই অনলাইন পেমেন্টের মতো কিছু বিষয়ে এর ব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি ইউরোপীয়কে প্রস্তুত হওয়ার সময় দিচ্ছিল।

অভিন্ন মুদ্রার প্রচলন অনেক ইউরোপীয় দেশের কাছেই ছিল কয়েক যুগের লক্ষ্য তথা স্বপ্ন। এখন ৩৪ কোটি ১০ লক্ষের কাছাকাছি লোক প্রতিদিনই কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে ইউরোকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যানুসারে, তাদের ইউরো বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের বিচারে দ্বিতীয় সর্ববৃহত্ মুদ্রা। ইইউর ২৮টি দেশের সবাই কিন্তু আবার ইউরো ব্যবহার করে না। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্য যেমন ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে পাউন্ডের ব্যবহার। যেসব দেশ এই মুদ্রাটিকে ব্যবহার করে তাদেরকে সম্মিলিতভাবে বলা হয়ে থাকে ইউরোজোন। ভ্যাটিকানের মতো ইইউর বাইরের কিছু দেশও অবশ্য এটিকে ব্যবহার করে। ইইউর অন্য দেশগুলোও ইউরোকে গ্রহণ করার পথ খুঁজছে।

ইউরোর অষ্টাদশ বর্ষ উদ্যাপনে ছিল নানা আয়োজন। ২০০২ সাল শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপ মহাদেশের ১২টি দেশের মানুষ একযোগে একে অপরকে ‘শুভ নববর্ষ’ বলার পরিবর্তে ‘শুভ ইউরো’ বলে উইশ করতে শুরু করেছিল। এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, কে কাকে আগে জানাতে পারবে বহু প্রতীক্ষিত শব্দ দুটি। কয়েক শতাব্দীর পুরোনো ও বিখ্যাত কিছু মুদ্রণ নিজেদেরকে সপে দিয়েছিল ইউরোর মাঝে। আবেগঘন সূচনার আগে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে অবশ্য প্রস্তুতির জন্যে পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৯-র প্রথম দিক থেকে ২০০২-র প্রারম্ভ, এই তিন বছর ছিল ক্রান্তিকাল। শেষোক্ত বছরের ১ জানুয়ারি ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ১ মিনিট ছুঁতেই সবকটি দেশের প্রত্যেকটি ক্যাশ মেশিনের সামনে চোখে পড়েছিল অগণিত হাত, নতুন টাকার ঘ্রাণের নেশায় বুঁদ হওয়ার জন্যে কারোরই যেনো সেদিন আর তর সইছিল না। এর মধ্যে কয়েকটি দেশে হাতাহাতি ও পুলিশের লাঠিচার্জের মতো বহু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে গিয়েছিল। মাঝরাতে তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়েছিল অসংখ্য মানুষ।

সেদিন থেকে পেরিয়ে গেছে বেশ কতোগুলো বছর। দীর্ঘ এ সময়ে কখনোই খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি। এর মধ্যে বারোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো সাতটি দেশ। একেবারে সূচনায় ইউরোতে বিলীন হওয়া সবচেয়ে বিখ্যাত মুদ্রাটির নাম হচ্ছে জার্মান মার্ক। প্রচলনের সময়ে এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রাগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশের পুনঃএকত্রীকরণে জার্মান মার্কের ভূমিকা ছিল বিশাল। ইউরোকে গ্রহণ করার পরপরই ক্ষান্তি দেওয়া হয়েছিল মার্ককে, যদিও ১২টি দেশের প্রত্যেকটি জনগণের জন্যেই সে সুযোগ ছিল যে, নির্দিষ্ট একটা সময় নির্ধারিত পর্যন্ত ইউরোর পাশাপাশি পুরোনো মুদ্রা দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে বিনিময়। ২০০২ সালের পুরোটাতেই নতুন টাকা নেবার জন্যে ইউরোপ জুড়ে ব্যাংকের সামনে লম্বা লাইন নজরে পড়তো। পুরোনো ধাতব ও কাগজি মুদ্রা সংগ্রহ করে সেগুলো ধ্বংসের দায়িত্ব পড়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর। অনেক পুরোনো  মুদ্রার সঙ্গে এখন পর্যন্ত চলে ইউরোর            বিনিময়। গোড়াতে প্রায় ১.৬ মার্ক সমান ছিল ১ ইউরো। নেদারল্যান্ডসের গিল্ডারের মান ছিল আরেকটু কম; ১ ইউরোর মূল্য ছিল ২.২ গিল্ডার, যেটি কিনা বিবেচিত হতো ধরার সবচেয়ে সুন্দর নোটগুলোর একটি হিসেবে। ইউরোর বিপরীতে  ইতালির লিরার মান নির্ধারিত হয়েছিল উনিশশরও বেশি।

প্রতি ইউরোর জন্যে স্পেনের পেসেতা গুনতে হতো প্রায় ১৬৬। অভিন্ন এ মুদ্রার বিপরীতে ফ্রান্সের ফ্রাংকের মান ধরা হয়েছিল প্রায় ৬.৬। আইরিশ ভাষায়  পান্ট-এর মানে হচ্ছে পাউন্ড, যদিও দেখার বেলায় যুক্তরাজ্যের পাউন্ডের সঙ্গে এর কোনো মিলই ধরা পড়তো না। পান্ট কয়েনসমূহের নকশা সাধারণ হলেও আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ছিল অসাধারণ, যেগুলো লক্ষ্যণীয় করা হতো দেশের বন্যপ্রাণিগুলোর ছাপ দিয়ে। পান্টের মান (০.৭৮) ছিল ইউরোর চেয়ে বেশি।

— বিজনেস ইনসাইডার অনুসরণে