মুখের সমস্যা ও ডায়াবেটিস

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২০, ২১:২৯

মুখের ভেতরে সাধারণত যে সমস্ত রোগ দেখি, সেগুলো হচ্ছে ডেন্টাল ক্যারিজ, মাড়ির রোগ ও পেরিওডেন্টাল ডিজিজ, মুখের ক্যানসার, অসমান দাঁত, ডেন্টাল সিস্ট ইত্যাদি। দেহের অন্যান্য রোগের জন্য মুখের মধ্যে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিত্সাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায় যে প্রায় ২০০ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ মুখগহ্বরে প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। বর্তমান কালের মরণঘাতী রোগ এইডস থেকে শুরু করে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, এমনকি গর্ভাবস্থায়ও অনেক রোগের লক্ষণ মুখের ভেতরে প্রকাশ পায়। যে সমস্ত ডায়াবেটিক রোগী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখেন না, তাদেরই মাড়ির রোগের প্রদাহ বা পেরিওডেন্টাল ডিজিজ অধিক মাত্রায় লক্ষণীয়। তবে তার অর্থ এই নয় যে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদেরই এই রোগ বেশি হবে।  পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাদের মুখে ডেন্টাল প্লাক রয়েছে এবং জিনজিভাইটিস রয়েছে, তাদের ডায়াবেটিসের কারণে এই মাড়ির রোগ আরো বেড়ে যায় এবং প্রদাহ তীব্রতর আকার ধারণ করে, পরবর্তী সময়ে দাঁতগুলো পড়ে যায়। মুখের আরো একটি বিশেষ রোগ হচ্ছে মুখের ঘা। মুখের এই ঘা নানা কারণে হতে পারে। যাদের বিভিন্ন রোগ যেমন—ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, উচ্চরক্তচাপ, রিউমেটিক ফিভার, রক্তস্বল্পতা, ক্যানসার, এইডস ইত্যাদি রয়েছে তাদের মুখেও ঘা লক্ষ করা যায়। যাদের ডায়াবেটিস বা হূদেরাগ রয়েছে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং দীর্ঘদিন যাবত্ ওষুধ গ্রহণ করছেন, তাদের মুুখেও একধরনের জীবাণু বিস্তার লাভ করতে পারে, যেমন তাদের মুখে ক্যানডিডা জীবাণুর কারণে ক্যানডিডিয়াসিস হতে পারে। আরো যে সমস্ত ঘা হতে পারে সেগুলোর মধ্যে লিউকোমিয়া, লাইকেন প্লানাস ইত্যাদি রয়েছে। লক্ষ রাখতে হবে মাড়িতে প্লাক জমা রয়েছে কি না। যদি থাকে তবে তা অবশ্যই স্কেলিং করিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুখে আরো একটি ঘা সব বয়সেই হতে পারে, এর নাম এপথাস আলসার। বিশেষ কোনো ভিটামিন ‘বি’-এর স্বল্পতা, কোনো দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, মুখের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে এপথাস আলসার বেশি হয়। অনেক সময় এই ঘা আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তবে উপযুক্ত সময়ে এই ঘায়ের চিকিত্সা করাতে পারলে ভালো। এই রোগের চিকিত্সা হলো দুুশ্চিন্তা দূর করা, ঘুম যাতে স্বাভাবিক হয় তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া এবং ওরাবেস-জাতীয় মলম স্টেরয়েড  স্থানীয়ভাবে ঐ স্থানে লাগিয়ে ঘা-কে তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করা। সম্প্রতি আমাদের দেশে এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে (বিশেষত ভারতে) গবেষণায় দেখা যায় যে যাদের ধূমপান ও জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে, তাদের মধ্যে মুখের ঘা খুব বেশি হয় এবং সেই সঙ্গে মুখে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। বিশেষত যারা পানের সঙ্গে জর্দা খান এবং নিয়মিত অনেকবার পান খান, তাদের মুখের ঘা বেশি হয় এবং লক্ষ করা গেছে যে অনেকেই তামাক পাতাকে হাতের মধ্যে নিয়ে চুনের সঙ্গে মিশিয়ে গালের মধ্যবর্তী স্থানে রাখেন। তাতে দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে ঐ স্থানে ঘা হতে পারে। শুধু ঘা নয়, পরে এই ঘা ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে। যারা নিয়মিত ধূমপান করেন এবং তামাক পাতা ও জর্দা দিয়ে পান অথবা তামাক পাতা গালের মধ্যে রেখে ব্যবহার করেন, তাদের শতকরা ১০০ জনের মুখের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যারা জর্দা খান বা তামাক পাতা খান, তাদের রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকি হতে পারে ৫০ ভাগ এবং যারা ধূমপান করেন এবং সেই সঙ্গে তামাক পাতাও পানের সঙ্গে ব্যবহার করেন, তাদের ঝুঁকি ১০০ ভাগ। সুতরাং যাদের মুখের ঘা রয়েছে তাদের এই সমস্ত অভ্যাস অবশ্যই ছাড়তে হবে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা এই সমস্ত অভ্যাস ছাড়তে পেরেছেন, তাদের মুখের ঘা থেকে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিত্সার পরও মুখের ঘা যদি দুই সপ্তাহ থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসি অথবা মাংসের টিস্যু পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কারণ মুখে এই সমস্ত অনেক ঘা বা সাদা ক্ষতগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন প্রি-ক্যারসার লিশন বা ক্যানসারের পূর্বাবস্থার ক্ষত। সুতরাং মুখের ঘা প্রতিরোধে দাঁত ও মুখের যত্ন নেবেন এবং সেই সমস্ত ঘা দেখা দেওয়ামাত্রই চিকিত্সার ব্যবস্থা নেবেন। মুখের ঘা ক্যানসার প্রতিরোধে আজই ধূমপান এবং সেই সঙ্গে তামাক পাতা বা জর্দার ব্যবহার বন্ধ করুন এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ এবং হূদেরাগের মতো রোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সাব্যবস্থা মেনে চলুন। কারণ প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই শ্রেয়, সস্তা ও নিরাপদ। তামাকজাত দ্রব্য ও ধূমপান আমাদের দেহ ও পরিবেশকে অনেক ক্ষতি করতে পারে; কারণ-

১. একটি সিগারেটের ধোঁয়ায় পনেরো বিলিয়ন পদার্থের অনুসমূহ (ক্ষুদ্রকণা) থাকে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান ও তামাক গ্রহণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হূাস পায়, ধূমপায়ীদের মধ্যে পুরুষত্বহীনতার সংখ্যা অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি

২. ধূমপানের কারণে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ এবং অন্ধও হতে পারে।

৩. ধূমপান মস্তিষ্কের রক্তের প্রবাহ কমিয়ে দিয়ে স্ট্রোকের কারণ ঘটায়।

৪. বিশ্বে প্রতিবছর কমপক্ষে ১০ লাখ লোক ধূমপানের কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়।

৫. ফুসফুসের ক্যানসারে যত লোক প্রাণ হারায়, তাদের শতকরা ৮৫ জন ধূমপানজনিত কারণে।

৬. ক্রণিক ব্রংকাইটিস ও হূদেরাগের যথাক্রমে ৭৫% ও ২৫% ধূমপানজনিত কারণে।

৭. যারা ধূমপান বন্ধ করে দেন, তারা অন্তত ধূমপায়ীদের চেয়ে দীর্ঘায়ু।

৮. ধূমপায়ী পিতা-মাতার সঙ্গে একই ঘরে থাকলে শিশুদের বড়ো হয়ে হূদেরাগে এবং ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দুটি ক্যানসার প্রতিরোধ সম্ভব

১. তামাক ও ধূমপানজনিত কারণে মুখ ও ফুসফুসের ক্যানসার।

২. হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসজনিত কারণে লিভার ক্যানসার।

প্রথমটির প্রতিরোধব্যবস্থা

(তামাক ও ধূমপান বন্ধ করুন।

দ্ব্বিতীয়টির প্রতিরোধব্যবস্থা

(হেপাটাইটিস প্রতিষেধক টিকা নিন।

 

হঅধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

১৫/এ, গ্রিন স্কয়ার, গ্রিনরোড

ঢাকা-১২০৫।