চর কুকরীমুকরি ম্যাডভেঞ্চার

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৩১

ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ (টিওবি) ফেসবুকভিত্তিক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভ্রমণবিষয়ক গ্রুপ। ক’দিন আগেই এর সদস্য সংখ্যা পেরিয়েছে ১০ লাখ। গতানুতিক ভ্রমণের বাইরে স্বনির্ভর ও ব্যতিক্রমী ভ্রমণে উত্সাহী করাই এ গ্রুপের কাজ। দায়িত্বশীল পর্যটন এ গ্রুপের মূলমন্ত্র। দেশে বা বিদেশে যেখানেই আমরা ভ্রমণ করি না কেন সবসময় এ ব্যাপারটিকে সামনে রাখি। গ্রুপের নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে একটি হলো টিওবি ম্যাডভেঞ্চার। মূলত অ্যাক্টিভিটিভিত্তিক আয়োজনের সাথে ক্যাম্পিংকে যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে ম্যাডভেঞ্চার ইভেন্টটি। এর আগে গতবছরই কক্সবাজারে আয়োজন করা হয়েছিল ম্যাডভেঞ্চারের প্রথম আয়োজন। এবারের আয়োজন করা হয়েছে ভোলা জেলায় অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপ চর কুকরীমুকরিতে।

টিওবির অন্য সব আয়োজনের মতোই ঘোষণা করা হয়েছিল এ আয়োজনের নিয়মকানুন । খরচ যা হবে সমানভাগে ভাগ করা হবে, আর শুধু ভ্রমণের জন্য গেলেই হবে না, নিজের কাজ নিজে করতে হবে, সেইসাথে অবদান রাখতে হবে গ্রুপের কার্যক্রমেও। ঢাকা-থেকে-ঢাকা ইভেন্টের জন্য খরচ ধার্য করা হয়েছিল ৩ হাজার টাকা করে। ভোলার বেতুয়াগামী লঞ্চে চড়ে মূল দলের সবাই রওনা হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে। তার আগেই ছোট্ট একটি অগ্রগামী দল পৌঁছে যায় চর কুকরীমুকরিতে। বাবুর্চি, ট্রলার, ক্যাম্পসাইটসহ অনেককিছুই আগে থেকেই ঠিক করে ফেলে প্রথম দল। আমি রওনা হয়েছিলাম খুলনা থেকে। বরিশাল হয়ে ভোলাতে পৌঁছে চরফ্যাশনে এসে মূল দলের সাথে যুক্ত হলাম।

 

চর কচ্ছপিয়া ঘাটে এসে দেখলাম রাব্বি ভাই আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছেন। অটো থেকে নেমে সবাই বিশাল একটি মানব চেইন তৈরি করে ব্যাগগুলো সব তুলে দিলো ট্রলারে। কিন্তু বাজার সব শেষ করতে না পারায় রওনা হওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত বাজার দলের সদস্যরা আসার পর আমরা রওনা দিলাম চর কুকরীমুকরির উদ্দেশ্যে। রওনা দেওয়ার পর থেকেই সৌন্দর্য শুরু হয়ে গেল। তবে চরফ্যাশনের এ অংশে অনেক মানুষের বসতি আছে। তেঁতুলিয়া নদী পার হয়ে আমরা বিশাল এক ম্যানগ্রোভ বনের দিকে এগুতে থাকলাম। তখনই জানতে পারলাম আমরা যাবো দ্বীপের মধ্য দিয়ে, খাল ধরে। জোয়ার আছে এবং প্রচুর পানিও আছে খালে। তবে সরু এ খাল ধরে অনেক সাবধানে চালাতে হবে।

দু-দিকে বিশাল সব বনের মধ্য দিয়ে চলতে শুরু করলো আমাদের ট্রলার। এত সুন্দর সেই দৃশ্য, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম আমরা। এ খাল ধরে যেতে দেখা পেলাম বিভিন্ন ধরনের পাখির, তবে হরিণের দেখা মেলেনি। আমাদের আগ্রবর্তী দল হরিণ তো দেখেছিলই, ভিডিও করেও রাখতে পেরেছে। আমরা অবশ্য শেয়াল দেখতে পেয়েছি, বনের ধারে রোদ পোহাচ্ছিল। খালের শেষপ্রান্তে এসে ট্রলার থেকে নেমে আমরা রওনা দিলাম আমাদের ক্যাম্পসাইটের উদ্দেশ্যে। রাব্বি ভাইরা আগেই জায়গা ঠিক করে রেখেছে। বনের একেবারে শেষপ্রান্তে ছায়াঘেরা সুন্দর একটি অংশে কয়েকটা তাঁবু দেখতে পেলাম। আমরা এসেই সবাই যার যার তাঁবু পেতে ফেললাম, এর মধ্যে দুপুরের খাবারও তৈরি ছিল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই পরিচিত হলাম।

জানা গেল, দলের বেশ কয়েকজন সদস্যই আজ প্রথমবারের মতো ক্যাম্পিং করতে এসেছেন। টিওবির সাথে এই প্রথম এসেছেন এ রকমও বেশ কয়েকজনকে পেলাম। সবাইকে স্বাগত জানিয়ে শুরু হলো ইভেন্টের প্রথম অ্যাক্টিভিটি বাথরুম তৈরি করা। গাছের ডাল, চটের বস্তা দিয়ে তৈরি হয়ে গেল অস্থায়ী বাথরুম। নিয়ম হলো যে যাবে বাথরুমে সে কাজ শেষ করে বালি ছিটিয়ে দিয়ে আসবে। ফলে পরের জনের জন্য সেটা চমত্কার ব্যবহার উপযোগী থাকবে। এদিকে আমি কয়েকজনকে নিয়ে গেলাম মাছের জন্য ফাঁদ পাততে। উপযুক্ত জায়গা দেখে ফাঁদ পেতে এলাম আমরা। দলের দু’জন তাদের নিজেদের ইনফ্লেটেবল ইঞ্চিনের বোট নিয়ে এসেছে। তাদের একজনের সাথে নদীর মোহনা থেকে ছোট্ট একটা ট্রিপ দিয়ে এলাম আমরা। গাছে টাঙানো হ্যামকে দুলে আর আড্ডাবাজি শেষ করে অনেক ক্লান্ত থাকায় সেদিনের মতো নিজের তাঁবুতে যখন ঘুমাতে গেলাম তখন রাত ১২টার বেশি বাজে।

গভীর রাতে তাঁবুর পাশে খসখস শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার। পাশের তাঁবুর তানভির ভাইকে হাঁক দিয়ে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কিছু শুনেছেন কি-না। উত্তর শুনেই বুঝতে পারলাম দুই তাঁবুর মাঝে শিয়াল এসে বসে আছে, আলো জ্বালাতেই ছুটে পালিয়ে গেল। কিছুটা ভয় পেলেও আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙলো, তেমন শীত লাগছে না। বাইরে বের হয়ে প্রকৃতির দৃশ্য দেখে মন ভালো হয়ে গেল, এত সুন্দর। খালের মুখে অনেকগুলো বক বসে থাকে। কিছু সারস, সরালিসহ নাম জানা অনেক পাখি দেখলাম। সকালে শুরু হয়ে গেল মজার মজার সব খেলার প্রতিযোগিতা। তানভীর মৃদুল ভাই ও তার দলের পরিকল্পনায় এ খেলা চললো দুপুর পর্যন্ত। এর মধ্যে আমি আর রিজভি ভাই জালে মাছ পড়েছে কি-না দেখতে গিয়ে একটা জীবিত মেটে সাপ দেখতে পাই।

রিজভি ভাই অনেক ধৈর্য্য নিয়ে সেটা খুলে বের করলেন জাল থেকে। ওনাকে সাহায্য করতে গিয়ে আমাকেও ধরতে হলো সাপটিকে। অবশ্য সাপকে মুক্ত করে ছেড়ে দিতে পেরে অনেক ভালো লেগেছিল। দুপুরে খাবার-দাবার শেষ বিকেলটা আমরা চারদিকে ঘুরিয়ে কাটালাম। অধিকাংশ মানুষই এখানে জীবিকানির্বাহ করে কাঁকড়া ও মাছ ধরে। আমাদের পাতা ফাঁদেও কয়েকটি কাঁকড়া ও ছোট মাছ ধরা পড়ে। কাঁকড়াগুলো বেশি ছোট হওয়াতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। রাতে আয়োজন করা হলো মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। খালি গলাতেই বেশ সুন্দর কয়েকটি গান শোনালেন দলের কয়েকজন। তবে চমক দেখালেন আমাদের বাবুর্চি মাহবুব ভাই। বড় একটি বোলকে ঢোল বানিয়ে চমত্কার স্থানীয় গান পরিবেশন করলেন তিনি।

দলের সাত সদস্য হাঁসের মাংস ভুনা, পোলাও, ডিমসহ রাতের খাবারের আয়োজন করে ফেললেন। কয়েকজন তাদের ছোট্ট পেনি স্টোভ (বহনযোগ্য চুলা) দিয়ে আমাদের কফিও বানিয়ে খাওয়ালেন। দলের সব সদস্যরা পানি বয়ে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে চমত্কারভাবে সব কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। দেখতে দেখতে এ কয়েকটি দিন যেন উড়ে গেল। এবার ফেরার পালা। তবে বরাবরের মতোই এবারো শেষদিন আয়োজন করা হলো পরিচ্ছন্নতা অভিযান। সবাই মিলে নিজেদের ক্যাম্পসাইট ছাড়াও দু-পাশের দুই ক্যাম্পসাইট থেকে ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে পলিথিনের ব্যাগে ভরে নিয়ে আসা হলো। কি দুর্ভাগ্য আমাদের, একটি ক্যাম্পসাইটে আগেরদিন সকালে চলে যাওয়া দলের সদস্যদের গাছের বড় একটি গুড়িতে জ্বালানো আগুন তখনো ভেতরে ভেতরে জ্বলছিল। গতরাতে আমাদের দলের দুই সদস্যের চোখে পড়েছিল, তারা ভালোমতো চেষ্টা করেছে বালি দিয়ে আগুন নেভানোর, কিন্তু কাজ হয়নি। লোকজন চলে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরও সেই আগুন জ্বলছিল। আমাদের জোগাড় করা সব ময়লার বস্তা পোড়ানোর জন্য আমাদের দলের যে সদস্যরা আরো কয়েকদিন থাকবেন তাদের দায়িত্ব দিয়ে ফিরে চললাম আমরা।