হুজুগে সুযোগ

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৩৩

/ অয়েজুল হক

 

অফিস ফেরত নিয়াজ সাহেব ঘরে ঢুকতেই স্ত্রী রহিমা বেগমের ঝাঁঝালো প্রশ্ন, ‘সবজি এনেছ?’                         ভদ্রলোক মলিন মুখে বলেন, ‘সবজি না খেলে খুব তো ক্ষতি নেই।’

মুখের উপর রহিমা বেগমের জবাব, ‘আমি না থাকলেও তো খুব ক্ষতি নেই। আমি আর তোমার সংসার করছি না।’

বউয়ের অবস্থা গ্যাস লাইটের মতো, গ্যাস লাইট হাতের ছোঁয়ায় হুট করে জ্বলে। রহিমা বেগম জ্বলছে সবজি আনা সংক্রান্ত না-বোধক শব্দে। তার জ্বলা-পোড়া মাস পেরিয়ে গেলেও নিঃশেষ হচ্ছে না। শীত আসার পর থেকে টমেটো, মুলা, গাজর, পাতাকপি, বাঁধাকপি, মুলা সবকিছুর দাম চড়া। শীতের সঙ্গে শীতের সবজি যেন কম্বল মুড়ি দিয়েছে। দিক। সবজি না খেলে তো আর মানুষ মরে যায় না। নিয়াজ সাহেব শান্ত গলায় বলেন, ‘সংসার করতে না চাইলে করবে না।’

রহিমা বেগম পাঁচ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী মহীয়সী নারী। মাঝে মাঝে নিজেকে আধুনিক যুগের বেগম রোকেয়া দাবি করেন। বিয়ের সময় তার ওজন ছিল ষাট কেজি। বর্তমানে আটাত্তর কেজি ওজন। বছরপ্রতি গড়ে দুই কেজি করে ওজন বাড়ছে। নিয়াজ সাহেবের কথা শুনে জাপটে ধরে বলেন, ‘কী ভেবেছ! চলে যাব? সংসার করছিও না, ছাড়ছিও না। শেষ দেখে ছাড়ব। সুযোগ পেয়েছ না...’

শুধু কথাতেই ক্ষ্যান্ত হন না। তাকে নিজের কক্ষে নিয়ে আছড়ে ফেলে বাইরে থেকে তালা মেরে দেন। জানালা দরজা বন্ধ থাকায় ঘরটা অন্ধকার। বউ না ডাকাত! গলা শুকিয়ে আসে। পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে ওঠে।

—হ্যালো।

—হু। সমবেদনা প্রকাশ করছি। গভীরভাবে শোকাহত।

কে, কিসের সমবেদনা, কেন শোকাহত নিয়াজ সাহেব বুঝে উঠতে পারেন না।

—কে বলছেন?

—আমি হেড অফিস থেকে জিএম সাবের বলছিলাম।

—ওহ, স্যার কেমন আছেন?

—ভালো আছি, নিয়াজ সাহেবের মৃত্যু সংবাদে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আপনি কী ওনার ভাই?

নিয়াজ সাহেবের বুকের ভেতরে ধড়ফড় করে। নিয়াজ সাহেবের মৃত্যু সংবাদ! করুণ সুরে বলেন, ‘স্যার আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে।’

—ভুল হচ্ছে মানে! আমাকে জানানো হলো নিয়াজ সাহেব মারা গেছেন।

—আমিই তো নিয়াজ। মারা যাইনি, আপাতত বদ্ধ ঘরে আছি। স্যার কী আড়তদার নাম শুনেছেন?

ওপাশে হা-হু কোনো শব্দ শোনা যায় না। নিয়াজ সাহেব বলেন, ‘আড়তদার যেমন পণ্য মজুত করে রাখে, আমার স্ত্রীও তেমন আমাকে ঘরে বন্দী করে রেখেছে।’

জিএম সাবের সাহেব খট করে লাইন কেটে দিলেন। একটু পর আবার মোবাইল বেজে ওঠে। মোবাইলের রিংটোন তার কাছে শেষকৃত্যের করুণ সুরের বিউগলের মতো মনে হয়। ফোন রিসিভ করতেই কেউ একজন বলবে, নিয়াজ সাহেবের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। সেটা তিনি হতে দেবেন না। ফোন রিসিভ করেই বলেন, ‘আমি নিয়াজ বলছি। আমার ধারণা আমি মরে যাইনি।’

অন্য প্রান্তে হারুন সাহেবের গলা শোনা যায়, ‘ভাই, সবকিছু নিয়ে মশকরা করতে নেই। গিয়াস ভাই মরে গেছেন।’

—কীভাবে! শীতকালীন সবজি না পেয়ে কী গিয়াস ভাইয়ের স্ত্রী...

হারুন সাহেব বন্ধু মানুষ হলেও কিছুটা চিত্কারের মতো করে বলেন, ‘স্টুপিড।’

গিয়াস সাহেবের হঠাত্ মরে যাওয়ার খবরে এমনিতেই বুকের ভেতরের ধড়ফড়টা বেড়ে গেছে তার উপর হারুন সাহেবের জোরালো স্টুপিড শব্দে নিয়াজ সাহেব কিছুটা লাফিয়ে ওঠেন। চাকরির সুবাদে গিয়াস সাহেবের সঙ্গে দীর্ঘ বছরের পরিচয়। পথচলা। মানুষটা মরে গেল!

রহিমা বেগম রাগী হলেও নির্দয় নয়। পরদিন সকালে দরজা খুলে দিয়ে বলেন, ‘আজ যদি সবজি না আনো তাহলে তোমার একদিন কী আমার দেড়মাস।’

নিয়াজ সাহেব কথা না বলে চুপচাপ অফিসের পথে পা বাড়ান। অফিসে নিয়াজ আর গিয়াস ভাই ছাড়া কোনো কথা নেই। কেউ বলেন, ‘স্যার, কী ভুলটাই না করল গিয়স ভেবে নিয়াজ সাহেবকে ফোন করেছেন। ইশ, গিয়াস ভাই কত ভালো মানুষ ছিল। বেচারা এভাবে চলে যাবে কে জানত!’ নিয়াজের সঙ্গে গিয়াস মিলে জগাখিচুড়ি অবস্থা। 

সারাদিন ঝিম ধরে পড়ে থেকে বিকালের দিকে বাড়ি ফেরার সময় দেখেন ফুটপাতে পেঁয়াজ বিক্রেতা। তাকে ঘিরে জটলা। হ্যান্ড মাইক নিয়ে সে কখনো বক্তব্য, কখনো গান, কখনো সিনেমার নায়কের মতো ডায়লগ দিচ্ছে, ‘ও পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ তুমি কোথায়? চলিতেছে পেঁয়াজ, হাঁটিতেছে পেঁয়াজ। কমে বাড়ে পেঁয়াজ, দেশি-বিদেশি পেঁয়াজ। সেই সুদূর তুরস্ক, মিশর থেকে বিমানে চড়ে। সুলভ মূল্য। ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল—সে দিন শেষ। এ যুগের কথা, বিমানে চড়িয়া পেঁয়াজ হাঁটিয়া চলিল।’

নিয়াজ সাহেব পাশ কাটিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। বাড়ির কাছে গনি মিয়ার সবজির দোকান থেকে আজ সবজি কিনবেন। কেন যেন গনি মিয়ার দোকানেও আজ লম্বা লাইন। সবজির দাম কী কমেছে! কত কমেছে? কাছে গিয়েই দেখেন সবাই সবজি কেনার জন্য সবাই হুড়োহুড়ি করছে। পাশের বাড়ির রফিককে প্রশ্ন করেন, ‘কীরে, সবজিতে কী হইছে?

রফিক কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, ‘বৃষ্টির পর হু-হু করে শীত বাড়ছে। আরো বাড়বে।

—হ্যাঁ।

রফিক হাঁসফাঁস করে দম টেনে বলে, ‘পৃথিবীর অবস্থা ভালো না। অস্ট্রেলিয়ায় আগুন...’

—তাতে তোর কী?

রফিক কিছুটা অবাক হয়ে বলে, ‘আমার কী মানে! সবজির দাম বাড়ছে। আপতত আশি টাকার টমেটো একশতে বিক্রি হচ্ছে। কাল দুইশ হবে, তারপর আর টমেটো পাবেন না। সব কিছুর একই অবস্থা। না-খাইয়া কি মইরা যামু?’

নিয়াজ সাহেব কিছু বলেন না। দোকানদার হাসিমুখে বেশি দামে সবজি বিক্রি করছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে হুজুগে সে সুযোগ   নিচ্ছে।    g