নীল সাগরে ভেসে ভেসে

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২৮

জাহিদ হাসান

 

জীবনে প্রথমবারের মতো সমুদ্র দেখবো ভাবতেই ভেতরটা আনন্দে নেচে উঠল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের এক্সকারশন ট্যুরের অংশ হিসেবে যাওয়া হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।

দীর্ঘ যাত্রা শেষে পৌঁছালাম কক্সবাজার। রাত ১০টা বাজে তখন। আগে থেকেই হোটেল বুকিং করা ছিল। সমুদ্র সৈকতের পাশেই ছিল হোটেলটি। হোটেলে রাতটা কাটিয়ে খুব ভোরেই আবার গাড়িতে করে রওনা দিলাম টেকনাফের উদ্দেশ্যে। সকাল সাড়ে ৯টায় শীপ ধরতে হবে। তাই যেকোনোভাবেই হোক এর আগে সেখানে পৌঁছানোটাই লক্ষ্য। সূর্যের আলো ফোটার আগেই তাই রওনা দিতে হলো। সকাল ৮টা নাগাদ পৌঁছালাম সেখানে। দেখলাম আমাদের মতো হাজারো পর্যটক এরইমধ্যে এসে পৌঁছে গেছে সেখানে। অবশেষে ৯টার দিকে শিপে গিয়ে উঠলাম সবাই। ঠিক সাড়ে ৯টায় ছাড়লো শিপ।

৩২ জন শিক্ষার্থীর গ্রুপে গাইড শিক্ষক হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশিদ এবং একই বিভাগের প্রভাষক মো. তাহমিদ হোসেন।

আনন্দে মনটা নাচতে শুরু করলো। জীবনে প্রথমবারের মতো সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। শিপ কিছুদূর এগুতেই সাদা রঙের হাজারো গাংচিল শিপের চারপাশে উড়তে লাগলো। অনেক পর্যটক আবার শখ করে খাবারও ছিটাতে লাগলো পাখিদের উদ্দেশ্যে। আর পাখিগুলো সেই খাবার পানিতে থেকে খুটিয়ে খেতে লাগলো। শিপেই চলতে থাকলো আড্ডা আর গান। প্রায় আড়াই ঘণ্টার অসাধারণ যাত্রা শেষে অবশেষে পৌঁছালাম স্বপ্নের সেন্টমার্টিনে। সেখানে হোটেল আগে থেকেই বুকিং দেওয়া থাকায় আর হোটেল খুঁজতে হলো না। সবাই হোটেলে গিয়ে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে সেখানেই দুপুরের খাবারটা সেরে নিলো সবাই।

সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য নিয়ে বলতে গেলে একটু বিপদেই পড়তে হবে। ৭টি পাড়া নিয়ে গঠিত এই দ্বীপটির প্রতিটি অংশই রূপের ডালা সাজিয়ে রেখেছে। স্বতন্ত্র তাদের প্রত্যেকের রূপ, কিন্তু এক সুতায় গাঁথা। ঠিক মুক্ত মালার মতো। তবে প্রকৃতি একেক সময় একেকভাবে সুন্দর। বিকেল বেলাটা এক কাপ চায়ের সঙ্গে দ্বীপের পশ্চিম পাড়ের বিচ থেকে আপনি হয়তো দেখতে পাবেন আপনার জীবনের সেরা সূর্যাস্ত। সকালটা কাটিয়ে দিন পূর্ব বিচে। মিয়ানমারের পাহাড় ডিঙিয়ে সূর্যের প্রথম কিরণ যখন আপনার চোখে ধরা দেবে, মনে হবে এক অন্য জগতে এসেছেন আপনি। দ্বীপের সর্ব দক্ষিণে বেশকিছু অংশ নিয়ে কোরালের ওপর ভর করে তৈরি হয়েছে ছেঁড়া দ্বীপ। বর্ষা মৌসুমে মূল দ্বীপ থেকে ছিঁড়ে যায় বা আলাদা হয়ে যায় বলেই এর নাম ছেঁড়া দ্বীপ। হেঁটে বা ট্রলারে করে যেতে পারেন এই দ্বীপে। সেন্টমার্টিনে চাইলে তাঁবুতেও এক রাত কাটিয়ে দিতে পারেন। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হয়। সেন্টমার্টিন দ্বীপের একটা বিশেষত্ব হলো এখানে ভাড়ায় সাইকেল পাওয়া যায়। ইচ্ছা করলেই আপনি মাত্র ৫০ টাকাতে পুরো দ্বীপটি সাইকেলে করে ঘুরে বেড়াতে পারবেন।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই ছুটলাম সি বিচে। সেখানে ফুটবল খেলা, সাগরে গোসল, সাইকেলে করে সি বিচে ঘুরে বেড়ানোর অসাধারণ সময়গুলোর তুলনা হয় না। নিরিবিলি এই দ্বীপের রূপ-সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গেলে কবি-সাহিত্যিকদেরও হয়তো গভীর ভাবনায় হারিয়ে যেতে হবে।

সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে রাতে চললো বার-বি কিউ পার্টি। তবে এটি মুরগির মাংসের বার-বি কিউ না। সেখানকার মাছের আঁড়ত থেকে ১০ কেজি ওজনের কোরাল মাছ কেনা হলো। সেই মাছেরই করা হলো বার-বি কিউ। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে আবারো ঘোরাঘুরিতে বেড়িয়ে পড়ল সবাই। রাতের সেন্টমার্টিন যেন আরো মনোমুগ্ধকর। রাতের খোলা আকাশ, আর সাগরের গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মৃদু বাতাস বিমোহিত করবে যে কাউকে।

সেন্টমার্টিনে ৩ দিন, ২ রাত কাটিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। ঠিক যেভাবে এসেছিলাম, ঠিক সেভাবেই। শিপে করে টেকনাফ, তারপর সেখান থেকে আবারো কক্সবাজার। আগের হোটেলটিতেই উঠলাম সবাই। রাতটা কাটিয়ে আবারো বেড়িয়ে পড়লাম কক্সবাজারের সি বিচের সৌন্দর্য অবলোকনে। সেন্টমার্টিন আর কক্সবাজার সি বিচের মধ্যে তফাতটা হলো সেন্টমার্টিন অনেক বেশি নিরিবিলি আর সেখানকার সাগরের স্বচ্ছ পানি। কক্সবাজার মোটেও নিরিবিলি না আর এখানে সাগরের পানিও ততটা স্বচ্ছ নয়। এখানকার সি বিচগুলোতে দিনরাত সবটা সময়ই পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। তবে এখানকার সাগরের বিশালতা আর সাগরের গর্জন মন ভরিয়ে দেবে সবার।

কক্সবাজারে দুই রাত-দুই দিন কাটিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। কক্সবাজার টু ময়মনসিংহ। দীর্ঘ যাত্রাপথ। তবে ফেরার পথে মহেশখালিতেও যাওয়ার সুযোগ হলো। সেখানকার বিখ্যাত পান খেতেও ভুল হলো না করো।

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার চাপ। এক প্রকার যান্ত্রিকজীবন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মানে অন্য আরেক অর্থও আছে। সে অর্থ বন্ধুত্বের। সে অর্থ জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়ের। আবারো হয়তো নিজের জীবন সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বো সবাই। ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, পরীক্ষার চাপ সামলাতে আবারো হয়তো দিক-বেদিক ভুলতে বসবো। কিন্তু তারপরেও ভুলবো না বন্ধুদের নিয়ে এই অসাধারণ ভ্রমণকাহিনির কথা, খামখেয়ালি-আড্ডাবাজির কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা, তাদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি সবকিছু মিলিয়ে এই ভ্রমণের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটাই ছিল অন্যরকম। স্মৃতির অকপটে অমলিন হয়ে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ও শিক্ষকদের সঙ্গে কাটানো এই গল্পগাঁথা।

 

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ