কাগজে বনায়ন!

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২৮

আহসান জোবায়ের

 

কাগজ থেকে হবে একটি গাছ, আর সে গাছে জন্মাবে একটি ফুল। কল্পনাটা অলিক মনে হলেও এক সত্য করে দেখিয়েছেন নারায়নগঞ্জের সুমন। তিনি এমন একটি কাগজ উদ্ভাবন করেছেন যেটা ব্যবহারের পর মাটিতে ফেলে দিলে তার থেকে জন্ম নেয় গাছ। সুমনের উদ্ভাবিত কাগজটি তৈরি হয় পুরনো পত্রিকা ও কাগজ থেকে। সুমন এর নাম দিয়েছে বন কাগজ।

বন কাগজে ৮ রকমের সবজি, ফল আর ৩ রকমের ফুলের বীজ আছে। রোপণের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। মাটির ওপর কাগজটা আস্ত অথবা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলে দিলেই হলো। সেই মাটিতে যদি পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকে তাহলে ৮-৯ দিনের মধ্যে গাছ দেখা যাবে। আর মাটি আর্দ্র না হলে কাগজটাকে মাটির ওপর রেখে একটু ভিজিয়ে দিলেই হলো। জমিতে যেমন সবজির বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয় তেমনই। ওপর থেকেই আলো, বাতাস আর পানির সাহায্যে এটাতে অঙ্কুরোদগম হয় এবং পাখি খেয়ে না ফেললে সেটা থেকে গাছ বড় হতে থাকে। এ বন কাগজ থেকে জন্মাবে বিলাতি ধনিয়াপাতা, লালশাক ও তিন জাতের শাক, পিয়াজ, মরিচ, দুই জাতের টমেটো ও ফুলের মধ্যে মোড়ক ফুল, কসমস, ডেইজি, ডিয়ানথুস, হেলিক্রিসমাসসহ ১১ জাতের বৃক্ষ। একটি বন কাগজ ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। অর্থাত্ একটি বন কাগজের ভেতরে থাকা বীজ ১ বছর পর্যন্ত সতেজ থাকবে। ১ বছরের ভেতর এটি মাটিতে ফেললে ফসল হবে।

প্রকৌশলী সুমন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবুল খায়েরের মেজো ছেলে। পড়াশোনা করেছেন একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রকৌশলী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট। এর আগে সৌরবিদ্যুত্, বায়োবিদ্যুত্, বায়োপ্লাস্টিক ও সরকারি বিভিন্ন প্রজেক্টে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘শালবৃক্ষ টিম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

বন কাগজের পরিকল্পনা কিভাবে এলো এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন বলেন, ‘কাগজের জন্ম গাছ থেকে। সে ক্ষেত্রে চিন্তা করি। সেই কাগজকে কীভাবে পুনরায় গাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। এছাড়া আমরা যে কাগজ ব্যবহার করি। লেখালেখি শেষে কাগজের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এক পর্যায়ে তা ফেলে দিই, যা বর্জ্যে পরিণত হয়। সেক্ষেত্রে গবেষণা শুরু করি এ বর্জ্য কাগজকে কীভাবে পরিবেশ রক্ষার সম্পদে পরিণত করা যায়। বন কাগজ তৈরির কাজটি অনেক কঠিন। আমার একার পক্ষে কাজটি শেষ করা সম্ভব হতো না। পুরো কাজটিতে সহায়তা করেছেন ইকরামুন্নেসা চম্পা। চম্পা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী।’

মাহবুব সুমনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরাতন কাগজ থেকেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাধারণ কিছু যন্ত্রের সাহায্যেই তৈরি করেন তার এই বিশেষ কাগজের মণ্ড এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই মণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফুল এবং শাকসবজির বীজ মিশিয়েই তৈরি করছেন বন কাগজ। আর ব্যবহারের পর এই কাগজ টবে কিংবা মাটিতে ফেললেই কাগজ পঁচে ১০-১২ দিনের মধ্যে মাটি থেকে বেরিয়ে আসবে শাকসবজি কিংবা ফুলের চারা গাছ। আপাতত মরিচ, টমেটো, লালশাক, ডাটাশাক, পেঁয়াজ, কসমস, মোরগফুলসহ আরো অল্পকিছু গাছের বীজ ব্যবহার করলেও ভবিষ্যতে আরো বিভিন্ন গাছের বীজ যুক্ত করবেন। সেইসঙ্গে এই কাগজের ব্যবহারের পরিধিও বাড়াবেন। তবে প্রাথমিকভাবে এই কাগজ উত্পাদনে খরচ একটু বেশি হলেও উত্পাদনের পরিমাণ বাড়লে খরচ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন। এরইমধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিশেষ পরীক্ষামূলকভাবে তাদের এই বন কাগজে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের জন্য অর্ডার করছে।