টুটুল মাহফুজ
কথিত আছে, হিন্দুধর্মের সাধক পুরুষ অদ্বৈত মহাপ্রভুর মা লাভা দেবীর গঙ্গা স্নানের খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শারীরিক সামর্থ্যের অভাবে ইচ্ছে পূরণের সম্ভাবনা ছিল না। অদ্বৈত তার মায়ের ইচ্ছে পূরণের জন্য যোগসাধনা বলে পৃথিবীর সমস্ত তীর্থের জল এক নদীতে এক ধারায় প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন। এই জলধারাই পুরনো রেনুকা নদী, বর্তমানে যা জাদুকাটা নদী নামে প্রবাহিত। তাহিরপুর থানার এই নদীর তীরে পনাতীর্থে প্রতিবছর চৈত্র মাসে বারুণী মেলা হয়। এই মেলা বারুণীযোগ নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। প্রতি বছর লাখো পূণ্যার্থীর সমাবেশ ঘটে এই বারুণী মেলায়। এদিনের জন্য ভক্তরা অধীর আগ্রহে থাকেন সারাবছর।
সুনামগঞ্জ জেলার আদি ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে লাউড় নামে একটি আলাদা রাজ্যপাট ছিল। জগন্নাথপুর থেকে বানিয়াচং এ রাজ্যের সীমানা, বর্তমান সমগ্র সুনামগঞ্জ জেলা, ময়মনসিংহ জেলা, হবিগঞ্জ নিয়ে গঠিত। রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন কেশব মিশ্র নামক এক ব্যক্তি। লাউড়ের রাজারা ছিলেন কাত্যান গোত্রীয় মিশ্র। তাদের উপাধি ছিল সিংহ। তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামে তত্কালীন লাউড়ের রাজা বিজয় সিংহের বাসস্থানের ধংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান।
লাউড়ে পঞ্চদশ শতাব্দিতে দিব্য সিংহ নামের রাজা রাজত্ব করতেন। কথিত আছে, বিখ্যাত বৈষ্ণব সাধক অদ্বৈতাচার্যের পিতা কুবের আচার্য তর্কপঞ্চানন দিব্য সিংহের মন্ত্রী ছিলেন। লাউড়ের রাজা দিব্য সিংহ বৃদ্ধ বয়সে রাজ্যভার তদীয় পুত্রের হাতে ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন এবং তদীয় মন্ত্রী পুত্র অদ্বৈতাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। অদ্বৈতাচার্যই বৈষ্ণব ধর্মের উজ্জ্বলতম নামে খ্যাত এবং দিব্য সিংহ কৃষ্ণদাস নামে পরিচিত। অদ্বৈতাচার্যের বাল্য নাম ছিল কমলাক্ষ। তিনি বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন লাউড় পরগনার নবগ্রামে ১৪৩৪/৩৫ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভূত হন। বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করার পর তার নাম হয় অদ্বৈত। পঞ্চদশ শতাব্দিতে অদ্বৈতার্য চৈতন্য বিষয়ক পদ রচনার সূত্রপাত করেন। দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফের মতে, সুনামগঞ্জ হিন্দু সমাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে চৈতন্য দেব প্রচারিত বৈষ্ণব ধর্ম সূচনা থেকে। অদ্বৈত স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সাধনা ফসল পনাতীর্থ আজো এখানে তার স্মৃতি বহন করে চলেছে। কালের কড়াল গ্রাসে অদ্বৈতর বাড়ি ও তার নির্মিত আশ্রম জাদুকাটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যা নব্যগ্রাম নামে খ্যাত ছিল।
১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে এই তীর্থের সূচনা করেন অদ্বৈত আচার্য্য। মানুষ তাকে গৌরআনা ঠাকুর বলে জানে। তার জন্মস্থান তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের নবগ্রামে। নদী ভাঙনে নবগ্রাম আজ বিলীন। সেসময় নবগ্রামের অবস্থান ছিল লাউড় রাজ্যের লাউড়ের গড় এলাকায়। তবে বর্তমানে মন্দির গড়ে উঠেছে জাদুকাটা নদীর তীরবর্তী লাউড়ের গড়ের পার্শ্ববর্তী রাজারগাঁও গ্রামে।
ছবি : লেখক
