স্মার্টফোনে নয়, বিকাল কাটুক খেলাধুলায়

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩৮

মো. ইমরান হোসেন

বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়েছে। চলছে শীতকালীন অবকাশ। গ্রামের বাড়িতে এসেছি অবকাশযাপনে। ক্রীড়ামোদী মানুষ হিসেবে গ্রামের মাঠে যাওয়া থেকে প্রথম দিনই নিজেকে আটকাতে পারলাম না। মাঠে গিয়েই একটা ধাক্কা খেলাম। মাঠ যে ফাঁকা! মাঠে খেলার জন্য কেউই নেই। ৩-৪ জন ছেলেকে দেখলাম গোল হয়ে বসে নিজ নিজ ফোন টিপছে! বিকাল বেলায় গ্রামের হাইস্কুল মাঠটিই ছিল আমাদের নিয়মিত গন্তব্য। সেখানে প্রতিদিন ফুটবল না হলে ক্রিকেট খেলা চলত। স্কুল জীবনের এমন একটা দিনও মনে পড়ে না, যেদিন মাঠটিতে খেলা হয়নি। এমনকি এই মাঠে বিকালবেলা কোনো সভা-সমাবেশ থাকলেও মাঠের একপাশে স্বল্প পরিসরেই ‘শর্ট পিচ’ ক্রিকেট খেলা চলেছে। মূল খেলায় সুযোগ না পেলে বাদপড়া খেলোয়াড়গুলোকে দেখেছি মাঠের কোনো একপাশেই অল্প জায়গা নিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলতে। মাঠের চারপাশ জুড়ে প্রচুর দর্শক সেই সাধারণ ম্যাচগুলোই উপভোগ করত। সেখানে একত্রিত হতো গ্রামের মুরুব্বিদের থেকে শুরু করে ছোট্টশিশুরা পর্যন্ত। মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে এলাকার মেম্ব্বার-চেয়ারম্যান পর্যন্ত একসঙ্গে উপভোগ করত সাধারণ এই খেলাগুলো; কিন্তু এসবই আজ অতীত হয়ে গেছে! খেলায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে শিশু-কিশোর কিংবা যুবকদের। খেলার মাঠও কমে যাচ্ছে; শহরে তো খেলার মাঠগুলো দখল পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। এরপরও যে মাঠগুলো অবশিষ্ট থাকছে, সেগুলোতেও আজ খেলা চলছে না। ক্রীড়াবিমুখ হয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম! নতুন প্রজন্ম খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে বাড়ছে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক বিষণ্নতা, হতাশা। নতুন প্রজন্ম তাই ঝুঁকছে অসুস্থ বিনোদনের দিকে। এজন্য স্মার্টফোনকে তারা অবলম্বন করছে। আজকে শিশু-কিশোর ও তরুণরা পর্যন্ত স্মার্টফোনে ক্ল্যাস অব ক্ল্যান, ব্লু হোয়েল থেকে শুরু করে পাবজির মতো অনলাইন গেইমস খেলছে। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে সারাদিন সময় অপব্যয় করছে। পর্নোগ্রাফিতে বুঁদ হয়ে থাকছে এই প্রজন্ম! এসবের ফলে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুল পড়ুয়া শিশু-কিশোরেরাও! কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এভাবে একটি প্রজন্ম আজ দেশের ভবিষ্যেক শঙ্কায় ফেলেছে! এই নতুন প্রজন্মই একদিন দেশ চালাবে! অনাগত হুমকি বিবেচনায় নিয়ে সুপথে আনতে হবে এই শিশু-কিশোর ও তরুণদের। তার জন্য প্রথম উদ্যোগই হোক তাদেরকে খেলার মাঠে ফেরানো।

স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে যাওয়া প্রজন্মকে বিকালবেলায় খেলার মাঠে ফেরাতে পারলেই অর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। খেলাধুলা সমাজের তরুণদের মাদকমুক্ত করতে সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ। শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যগঠনে যে খেলাধুলা কতটা প্রয়োজনীয়—তা আলাদা করে বর্ণনা করার দরকার নেই। ক্রীড়ামোদী মানুষ মানসিকভাবে হয় দৃঢ়, শক্তিশালী, উদার ও পরিচ্ছন্ন। তাই নতুন প্রজন্মকে আবার খেলার মাঠে ফেরাতে হবে। বিকালবেলায় শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠে ফেরাতে অভিভাবক, শিক্ষকদের পাশাপাশি সমাজ সচেতনদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে; সেটা হলো স্মার্টফোনে আসক্তি। স্মার্টফোনের সুবিধাগুলো অবশ্যই শিশু-কিশোরদেরও পাওয়া উচিত; কিন্তু এর ব্যবহার যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। বিকালবেলায় তাদের হাত থেকে স্মার্টফোন সরাতে হবে, পাঠাতে হবে খেলার মাঠে। প্রাণহীন খেলার মাঠগুলো শিশু-কিশোরদের পদচারণায় আবারও সজীব হয়ে উঠুক; আমাদের নিরানন্দ বিকালগুলো ক্রিকেট-ফুটবলে আনন্দঘন হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়