তালেব রানা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার রেশ এখনো কাটেনি। বরং বর্তমান পরিস্থিতি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতো। যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে অস্থির করতে পারে পুরো অঞ্চলকে। এরই মধ্যে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করে নিয়েছে ইরান। তারা এই ঘটনাকে অনিচ্ছাকৃত তবে ক্ষমার অযোগ্য মানব ভুল বলে বর্ণনা করেছে।
গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন থেকে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যার বদলা নিতে গত বুধবার ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পিএস৭৫২ তেহরানে বিধ্বস্ত হয়। বিমানের ১৭৬ আরোহীর সবাই নিহত হন। ফ্লাইটটি ইউক্রেনীয় রাজধানী কিয়েভের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই ইমাম খোমেনি বিমানবন্দরের কাছে আছড়ে পড়ে বিমানটি। নিহতদের মধ্যে ইরানের ৮২, কানাডার ৫৭, ইউক্রেনের ১১, সুইডেনের ১০, আফগানিস্তানের চার এবং যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন জন করে নাগরিক ছিলেন।
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে ইরান এটিকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করে। তবে প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা দাবি করে যে, বিমানটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ভিডিও প্রকাশের পর তেহরানের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিমান ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করে নিয়েছে ইরান।
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভুল করে ফ্লাইট পিএস৭৫২ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি যাত্রীবাহী বিমানটি চলে এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে থাকায় ইরানের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে ছিল। এমন অবস্থায়, মানব ত্রুটির কারণে ফ্লাইটটিতে আঘাত হানা হয়। বিমানটিকে ভূপাতিত করার কারণে ক্ষমা চেয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সিনিয়র কমান্ডার আমিরালি হাজিজাদেহ সব দায় কাঁধে নিয়ে বলেছেন, এই দৃশ্য দেখার চেয়ে আমি মরে যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। যোগাযোগ বিভ্রাটের কারণে এটা ঘটেছে। ক্ষেপণাস্ত্র যারা ছুঁড়েছেন সিদ্ধান্ত নিতে তাদের হাতে ১০ সেকেন্ডের মতো সময় ছিল। সব দিক বিচার-বিবেচনার সুযোগ ছিল না।
এক টুইট বার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ক্ষমার অযোগ্য ভুল। তিনি ইউক্রেনের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ইরানের দায় স্বীকারের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জবাবদিহিতা এবং স্বজনহারা পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আমি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার চাই। আমার সরকার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না।
ইরান দায় স্বীকার করার পর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করে বিবৃতি দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ইরান একটি পূর্ণ ও স্বাধীন তদন্ত করবে, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনবে, নিহতদের মরদেহ ফিরিয়ে দেবে, ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করবে বলে আশা করি। ইতিমধ্যে ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিহতদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি ইরান ও ইউক্রেনের আপোষ-রফার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, সাধারণত ঠিকাদার ও বিমাকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ দেয়। কিন্তু বিমানটি বিধ্বস্তের কারণ স্বাভাবিক না হওয়ায় দুই দেশকে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।
বিশ্বে বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে মালয়েশিয়ার ফ্লাইট এমএইচ১৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। ২৯৮ জন আরোহী নিহত হয়। ২০০১ সালের ৪ অক্টোবর সাইবেরিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৮১২ ভূপাতিত করা হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুবাইগামী ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ বিমানটি ভূপাতিত হয়। পারস্য উপসাগরে চালানো ঐ হামলায় ২৯০ জন যাত্রী নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, রাডারে এটিকে এফ-১৪ যুদ্ধবিমান ভেবে হামলা করা হয়। এমন আরো অন্তত আটটি ঘটনা অতীতে ঘটেছে। যেখানে বেশিরভাগ সময় বলা হয়েছে, অনিচ্ছাকৃতভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের ভুল স্বীকারের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান হয়তো ভেবেছিল ইরাকে মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা জবাব দিতে বিমান পাঠিয়েছে বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। হয়তো এই ভুলের কারণে তারা বিমানটিকে ভূপাতিত করেছে। যদিও ইউক্রেন বলেছে, এই হামলা ইচ্ছাকৃত কি না সেটা তার দেশ তদন্ত করবে।
এদিকে এ ঘটনায় ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে। শনিবার ইরান দায় স্বীকার করার পর রাজধানী তেহরানে কয়েকশ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। তারা শীর্ষ নেতা আলী খামেনির পদত্যাগ এবং মিথ্যাবাদীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে।
ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি মার্কিন হামলায় নিহত হওয়ার পর তেহরান-ওয়াশিংটন উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সময়ে জাতীয় ঐক্যকে অটুট রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে পালটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিল ইরান। কিন্তু বিমান ভূপাতিত করার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অসেন্তাষ ভাবিয়ে তুলছে দেশটির সরকারকে।
