ঝাঁকুনি খেতে পারে এশিয়ার তেল বাজার

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৬

এম এ আলআমিন

 

মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটে থাকে। কারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কাজ করে। তবে সরবরাহে ছেদ পড়েনি নিশ্চিত হওয়ার পর মূল্য পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। বৈশ্বিক তেলের বাজারের জন্য যেমন, এশিয়ার তেলের বাজারের জন্যও একই কথা খাটে। গত এক বছর ধরে তেলের বাজারে মোটামুটি এরকম প্রবণতাই দেখা গেছে।

তেলের বাজার বা জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্ক আছে অর্থনীতির প্রতিটি খাতের। এই খাতে দর ওঠানামার সর্বশেষ উদাহরণটি দেখা গেল বুধবার ইরাকের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর। ঘাঁটি দুটি মার্কিন সৈন্যরা ব্যবহার করছে। ইরানের ঐ হামলা চালায় দেশটির সামরিক বাহিনীর চৌকস শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার বদলা হিসেবে। সোলাইমানি বাগদাদে ৩ জানুয়ারি ভোররাতে মার্কিন ড্রোন হামলায় আরো কয়েকজনের সঙ্গে নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এক সপ্তাহের কম ব্যবধানে একে অন্যের স্বার্থে আঘাত হানে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে তেলের বাজারের ওপর। বুধবার ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দর বাজারে ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও তেলের দর আচমকা অনেক বাড়েনি। বরং যা বেড়েছে তা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু বিষয়টি এশিয়ার জ্বালানি খাতে উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ এক সময় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল ইউরোপ ও আমেরিকা। এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেল আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে আছে এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে চীন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া। কাজেই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এসব দেশের মুদ্রাস্ফীতি যেমন বাড়বে তেমনি নিম্নমুখী হবে এখানকার প্রবৃদ্ধি।

হংকংয়ের ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইনস্টিটিউটের (ই আই ইউ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক পিটার কিয়েরনান বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা দ্রুত নিরসন হলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। হুমকির মুখে পড়বে এখানকার জ্বালানি নিরাপত্তা। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হামলার পর। ঐ হামলার পর হঠাত্ করেই সৌদির তেল উত্পাদন অর্ধেকে নেমে যায়। তেলের দাম এক লাফে অনেক বাড়ে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় আবকাইক ও খুরাইসে আরামকোর দুটি স্থাপনায় হামলাগুলো হয়। লক্ষণীয় আরামকো হামলা এবং সোলায়মানি হত্যা দুটি ঘটনার পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়নি। রেফইনফিনিটিভের তথ্য মতে, আগস্টের প্রথম দিক থেকে এ পর্যন্ত অশোধিত তেলের দর ২৩ ভাগ বেড়েছে। ২০০৮ সালের শেষ দিকে যে দর ছিল সে তুলনায় এটি ৩৭ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্ব বণিজ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের যৌথ সংস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০১৮ সালে চীন ছিল বিশ্বের শীর্ষ তেল আমদানিকারক । ঐ বছর বৈশ্বিক অশোধিত তেলের ২০.২ শতাংশ কেনে চীন। এরপর ছিল যুক্তরাষ্ট্র ১৩.৮ শতাংশ, তারপর ভারত ৯.৭ শতাংশ। এরপর শীর্ষ পৌঁছে ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। চীন ও ভারত দুটো দেশই প্রথম তেল আমদানিকারক হলেও দুদেশের চাহিদার মধ্যে পার্থক্য আছে। চীন যা আমদানি করে একটি বড়ো অংশ যায় শিল্পে, আরেকটি অংশ শোধিত করে আবার অন্যদেশে রফতানি করা হয়। কিন্তু ভারত যা আমদানি করে তার ৮৩ শতাংশ যায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে। থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে অশোধিত তেল আমদানির ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কোনো কারণে এই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা ভোক্তাবাজারকে ব্যাপক প্রভাবিত করে। ভারতের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত দাম যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে। কারণ, ২০১৩ সালের পর দেশটির প্রবৃদ্ধির হার এখন সবচেয়ে মন্থর। এ অবস্থায় তেলের দাম বাড়লে তা সরকারি ব্যয়ের ওপর যথেষ্ট চাপ ফেলবে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও অর্থনীতি বহুমুখী করার মাধ্যমে দেশগুলো সেই চাপ অনেকটা প্রশমিত করতে পারবে।