প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। সবুজ বনভূমির মাঝে লাল ইটের তৈরি ইমারত মনোরম ক্যাম্পাসকে ভিন্ন রূপ দিয়েছে।
ঢাকার অদূরে সাভারে ৬৯৭ দশমিক ৫৬ একর এলাকার ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে। ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট তত্কালীন সরকার এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার পূর্ব নাম জাহাঙ্গীরনগরের সঙ্গে মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করেন। এরপর ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট পাশ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রাখা হয়। গতকাল রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়টি তার প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছর পেরিয়ে ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা দিনটি উদ্যাপন করেন।সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বরে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন উড়িয়ে দিবসটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। উদ্বোধনের পর উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রা শেষে সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বেলা ৩টায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্য প্রদর্শনী, বিকেল ৫টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যা ৭টায় ‘নকশীকাঁথা ব্যান্ডের’ সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
প্রতিষ্ঠালগ্নে মাত্র চারটি বিভাগ, ২১ জন শিক্ষক ও ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে ৬টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউট মিলিয়ে মোট ৭০০ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ছেলেমেয়েদের জন্য সমান ৮টি করে মোট ১৬টি আবাসিক হল রয়েছে।
১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম, যিনি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ২০১৪ সালের ২ মার্চ থেকে দায়িত্বরত (দ্বিতীয় মেয়াদসহ)।
বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য লালন করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দেশের সুউচ্চ শহিদ মিনার। ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘অমর একুশে’ ভাস্কর্য। স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে হাত-পা হারানো দেশের বীর সন্তানদের শ্রদ্ধায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’। এছাড়া মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের প্রথম প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ স্থাপিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিভাগের অধীনে উয়ারী বটেশ্বরে খননকার্য চালানো হয়। বিজ্ঞান গবেষণার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত হয়েছে দেশের সর্ববৃহত্ ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’।
তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও হলগুলোতে রয়েছে সিটের তীব্র সংকট। এর কারণে ‘নিকৃষ্ট গণরুম সংস্কৃতি’ থেকে বের হতে পারছে না হলগুলো। এছাড়া হাতেগোনা কয়েকটা বিভাগ ছাড়া বেশির ভাগ বিভাগে কোনো গবেষণা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দও অপ্রতুল। এদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের তালে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে আছে প্রাচীন চিন্তা-ধারণা নিয়ে। লাইব্রেরি থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীর পরীক্ষা পদ্ধতি, রেজাল্ট তৈরি করার সিস্টেম সনাতন পদ্ধতিতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ভুগতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। ২৭ বছর ধরে নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জাকসু) নির্বাচন। এ কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো অব্যক্ত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের জন্য আগত প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার কাজে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত কয়েক মাস যাবত্ উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে অস্থির রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের।

