নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান জরুরি

রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বদলায়নি

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৩৬

 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নানামুখী কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর রেমিট্যান্স ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে ৫২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৭ সালে বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। চলতি বছর শেষে বৈশ্বিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। উন্নত দেশগুলোতে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সবল অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। রেমিট্যান্সে বিশ্বে ছয়টি আঞ্চলিক ভাগ রয়েছে। সব অঞ্চলেই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। তাছাড়া, তেলের দাম বৃদ্ধিতে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো (জিসিসিভুক্ত দেশ) ও রাশিয়া ফেডারেশন থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে (ইউএই) বিশেষতঃ সংযুক্ত আরব আমিরাতে, যেখানে ২০১৮ সালের  প্রথমার্ধে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ২০ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৪ শতাংশ।  তাছাড়া, পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারাবিয়ান এলাকায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং সাব সাহারা আফ্রিকা অঞ্চলে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ হারে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হবে।

চলতি বছরে রেমিট্যান্স সংগ্রহে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রাখবে ভারত। চলতি বছর ভারতীয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ৭৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স সংগ্রহের দিক থেকে শীর্ষ দেশের তালিকায় ভারতের পর পরই আছে চীন ৬৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, তারপর মেক্সিকো ও ফিলিপাইন উভয়েই ৩৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, মিসর ২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, নাইজেরিয়া ২৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ২০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, ইউক্রেইন ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, নবম স্থানে বাংলাদেশ ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং দশম অবস্থানে ভিয়েতনাম ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। চীন ছাড়া বাকী দেশগুলোর রেমিট্যান্সের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট দেশের মোট বিদেশি বিনিয়োগের চেয়েও বেশি। গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি রেমিট্যান্স আসলেও বিশ্বে রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান বদলায়নি।

গত তিন বছরে ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশ চাঙা রয়েছে। ২০১৭ সালে রেমিট্যান্স আসে ৬৫ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার যা ২০১৬ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে ভারতের রেমিট্যান্স জিডিপির ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ছিল। ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রেমিট্যান্স ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৩২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে যা ২০১৭ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ।  বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৯০ ও ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০১৯ সালের পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহ হচ্ছে নেপাল ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কা ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, আফগানিস্তান শূন্য দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান নেপালে সবচেয়ে বেশি ৩০ দশমিক ১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, ভুটানে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, আফগানিস্তানে ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মালদ্বীপে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

বৈশ্বিক রেমিট্যান্সে জিডিপিতে অবদান সবচেয়ে বেশি কিরগিজ রিপাবলিকের ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ, তারপর টংগো ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ, তাজাকিস্তান ৩২ দশমিক ২ শতাংশ, নেপাল ৩০ দশমিক ১ শতাংশ, হাইতি ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, ইয়েমেন ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, পশ্চিম তীরবর্তী গাজা ২১ দশমিক ৩ শতাংশ, গাম্বিয়া ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপ ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হুন্ডুরাস ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কিছুটা কোণঠাসা হওয়া, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোয় অভিবাসন হার হ্রাস পাওয়া এবং তেলে মূল্য হ্রাসের সুবিধা সংকুচিত হওয়ায় এমনটা হতে পারে। পারস্ব উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাটি হচ্ছে বাহরাইন (জিসিসি), কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও ইউএইর সরকারগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনিতক জোট। ২০১৯ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মাঝারি আকারের হবে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর রেমিট্যান্স ৪ দশমিক ৫৪ হাজার হাজার ৯০০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক রেমিট্যান্স হার ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ৭১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি বাড়েনি। বিশেষ করে সৌদি আরবের জাতীয়করণ নীতি এবং ভারতের সস্তায় শ্রম রপ্তানির কারণে এ সময়ে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। যে কারণে রেমিট্যান্সের বড় উত্স সৌদি আরব থেকে প্রবাহ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম উত্স মালয়েশিয়া। দেশটি থেকে প্রত্যাশিত রেমিট্যান্স না আসায় গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, প্রবাসীরা তাদের আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ পাঠাচ্ছেন ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৮০ শতাংশই আসছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে অনানুষ্ঠানিক পথে। সংশ্লিষ্টরা একে দেখছেন ডিজিটাল হুন্ডি হিসাবে। জানা যায়, মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে বৈধ প্রবাসী ৪ লাখ। বাকি ৬ লাখই অবৈধ। বিপুল সংখ্যক এ অবৈধ প্রবাসীই মূলতঃ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। অবৈধ হয়ে পড়ায় টাকা পাঠানোর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট না থাকার কারণেই মূলতঃ অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছেন তারা।  এছাড়া, অনানুষ্ঠানিক পথে পাঠালে রিঙ্গিতের বিপরীতে টাকার মানও বেশি পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনানুষ্ঠানিক পথেই সিংহভাগ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা। 

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে জানা যায়, জাপানে জনশক্তি রপ্তানি সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জাপানে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশকে লাখ লাখ বেকার তরুণক জনশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য নতুন নতুন শ্রম বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ ভোগ করছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ তরুণ। এদের শ্রমকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। সেই সাথে ওমান, কাতার, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে নতুন বাজার খুঁজতে হবে এবং সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। যে সব কর্মী বিদেশে অবৈধভাবে গমন করেছে তাদেরকে বৈধ করার জন্য সরকারিভাবে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে। তাছাড়া, দেশের তরুণ তরুণীদেরকে আধুনিক কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করতে হবে।