কৃষি প্রধান বাংলাদেশে মৌমাছি পালন, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। মৌমাছি পালনের মাধ্যমে মধু উত্পাদন ছাড়াও পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষিজ ও ফলজাত দ্রব্যের ফলন বৃদ্ধি, উন্নতমানের বীজ উত্পাদন ও বনজ সম্পদ উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখা সম্ভব। যা আমাদের কৃষি প্রধান দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে মৌমাছি পালনের প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক বৃক্ষ রোপণ, উদ্ভিদ তথা পরিবেশের ভারসাম্য ও জলবায়ু সংরক্ষণ এবং সমৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় মৌচাষ কার্যক্রমের আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আয়ের তুলনায় স্বল্প শ্রম ও স্বল্প পুঁজির বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা খরচ করে আলাদাভাবে কাঁচামাল ক্রয় করতে হয় না এর কাঁচামাল প্রাকৃতিকভাবে সহজলভ্যই বলা যায়। বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছাড়া নির্দিষ্ট জমি কিংবা আলাদা ঘরের প্রয়োজন হয় না। এ কাজ বেকার ও যে কোনো পেশায় নিয়োজিত মানুষের পক্ষে করা সম্ভব। পুষ্টি ও পরিবেশ উন্নয়নসহ জলবায়ু সংরক্ষণে সহায়কও বটে। এর মাধ্যমে বিশুদ্ধ মধুর অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। ফল ও ফসলের গুণগত মান সমৃদ্ধি ও ফলন বৃদ্ধি ঘটানো যায়। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে মধু খেলে দীর্ঘায়ুসহ সুস্বাস্থ্য লাভ ও রক্ষায় সহায়ক শক্তি যোগায়। মৌচাষ ও মধু শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ শ্রেণির মানুষ বাড়তি উপার্জন নিশ্চিত করতে পারে।
উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪০০ বছর আগে মৌচাষ শুরু হলেও বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে। সূচনালগ্নে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং প্রশিকার মত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নিবিড় প্রচেষ্টায় আজকের বাংলাদেশে মৌচাষের বিষয়টি স্বল্প শ্রম ও স্বল্প পুঁজির বিনিয়োগে তুলনামূলক অধিক মুনাফালাভের সম্ভাবনাময় পেশা ও ব্যবসা হিসেবে জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মাত্র ২৫-৩০ হাজার মৌচাষি সৃষ্টি হয়েছে। এ সংখ্যা অনুযায়ী এখন পর্যন্ত প্রতি ৩/৪টি গ্রামে গড়ে ১ জন করে মৌচাষিও সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। অথচ সুষ্ঠু এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার আওতায় লাগসই প্রযুক্তি ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৌচাষ ও মধু শিল্পে নিয়োজিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যুগোপযোগী গবেষণাসহ মৌচাষ সম্প্রসারণ ও মধু বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ১ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন মধু উত্পাদিত হচ্ছে এর মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক মৌচাষের মাধ্যমে ১ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন, সুন্দরবন অঞ্চলের মধু শিকারিদের মাধ্যমে ৫০ মেট্রিক টন। তবে দেশব্যাপী যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় তাহলে মোট মধু উত্পাদনের পরিমাণ ৩৫ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা সম্ভব।
মধু বাজারজাতকরণে বাংলাদেশে বিদ্যমান পর্যায় এবং পদ্ধতি খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে এখন। ভালো মধুর চাহিদা সব সময়েই রয়েছে। তবে ভোক্তার কাছে তা পৌঁছাতে যে প্রক্রিয়া চালু রয়েছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। দেশে কোনো কোনো জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণে মধু আহরণ হচ্ছে বটে তবে তা বাজারজাতকরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় মৌচাষিরা তাদের উত্পাদিত মধু যথাযথ মূল্যে বিক্রি করছেন না। ওদিকে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধু শহরের সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লার মুদির দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো দেশের মধুর বাজার দখল করে রেখেছে। অথচ আমাদের দেশে উত্পাদিত মধুর গুণগতমান বিদেশি মধুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আবার কোথাও কোথাও ভেজাল মধু কিনে ক্রেতারা হরদম ঠকছেন, এমন ঘটনাও প্রায় ঘটছে। এখন জরুরিভাবে আমাদের দেশে উত্পাদিত মধু সুষ্ঠুভাবে বাজারজাতকরণের জন্য বিভিন্ন বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মধু উত্পাদনকারী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
