ফুলের বনে ফুলের সনে

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ২০:০০

l সুমন্ত গুপ্ত

 

ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে বারোটা বাজে। আমরা বের হলাম গন্তব্যের উদ্দেশে। ত্রিচক্রযানে করে আমরা এগোচ্ছি বাসস্ট্যান্ডের দিকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে। দেখলাম বাসস্ট্যান্ডে কাঙ্ক্ষিত বাস দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিচক্রযান থেকে নেমেই বাসের টিকিট কাটলাম। কিন্তু আমাদের আরেক ভ্রমণসঙ্গী পৃথুর দেখা নেই। ফোন দিলাম। সে জানাল, আশপাশেই আছে। আর স্বল্প সময়ের মধ্যে এসে উপস্থিত হলো। বাস ছাড়ল যথাসময়ে। আমরা যাচ্ছি প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে।

চাষাড়ায় পৌঁছালাম। বাস থেকে নেমে খানিকটা সময়ের জন্য গেলাম মামাবাড়িতে। সেখান থেকে বেরিয়ে দুটি রিকশা নিয়ে আমি, সানন্দা, পৃথু, অনিক, রমা, অন্তরা এগিয়ে চললাম গুদারা ঘাটের দিকে। যাত্রাপথ ঠিকভাবে চিনি না, তাই আগন্তুকদের কাছে প্রশ্ন করেই এগোতে লাগলাম। পথ না চিনলে যা হয়, পথ আর শেষ হতে চায় না। অবশেষে পৌঁছলাম নদীর ঘাটে। ত্রিশ টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া করলাম ওপারে যাওয়ার জন্য। মন খুব উত্ফুল্ল ছিল, নতুন একটি জায়গায় যাচ্ছি তাই, কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীতে দূষণ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। যাই হোক, নদী পার হয়ে ঠিক করলাম ইঞ্জিন চালিত যান। আমরা চলছি গন্তব্য পানে। কোথাও পিচঢালা, কোথাও ভাঙাচোড়া রাস্তা। পঞ্চাশ মিনিট পেরোল কিন্তু এখন সেই কাঙ্ক্ষিত ফুলবনের দেখা পেলাম না। মন সব সময় কুডাকটাই আগে দেয়। ভুল পথে চলছি না তো! আমাদের রিকশাওয়ালাকে বললাম, ‘ঠিক পথে যাচ্ছি তো? এখন দেখা পেলাম না ফুলবনের!’ তিনি বললেন, ‘আরেকটু সামনে গেলেই দেখা পাবেন।’ তার কথামতো একটু পরেই দেখতে পেলাম, সড়কের দুই পাশে আবাদ হচ্ছে হরেক রকমের ফুলের। যত সামনে এগোই ফুলের মোহনীয় রূপ আমাদের ততই বিমুগ্ধ করতে লাগল। আমরা নেমে পড়লাম ফুলবনের ধারে। সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতার প্রতীক ফুলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা চিরন্তন। ফুলের চাহিদা তাই ক্রমবর্ধমান। ফুল শুধু পবিত্রতার প্রতীকই নয়। ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়, এমনকি শোকেরও এক অনুষঙ্গ। আর এর চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এদেশের অনেক জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে। তেমনি নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার দিঘলদি ও সাবদী এলাকায় হচ্ছে ফুলের চাষ। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুলের ক্ষেত। ফুলই এখানে ফসল। বাতাসে ফুলের মিষ্টি সৌরভ, মৌমাছির গুঞ্জন, প্রজাপতির ডানার জৌলুশ আর রঙের অফুরান সৌরভের সমাহার। শত শত বিঘা জমি নিয়ে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজি জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ আরো বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ হয় এখানে। দেখে মনে হবে, সুন্দর বাংলাদেশের বুকে এক টুকরো স্বর্গ! ফুলের তীব্র সুগন্ধ, অসংখ্য মৌমাছি-প্রজাপতিদের উড়ে যাওয়া দৃশ্য মন কেড়ে নেবে। এখানকার ফুলচাষিদের মনটা ফুলের মতোই সুন্দর। যেকোনো বাগানে ঢুকে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ান, ছবি তুলুন, পছন্দমতো কয়েকটা ফুল তুলুন; কেউ কিছু বলবে না। বরং আপনার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দেবে। তবে ফুলের বাগানে ঢোকার আগে অবশ্যই চাষিদের অনুমতি নেবেন। আমরা ফুলবনে একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। এরমধ্যে দেখলাম একজন খুব মনোযোগ দিয়ে জমিতে কাজ করছেন। নাম জানতে চাইলে বললেন, ‘ইকবাল হোসেন।’ কতটুকু জায়গার ওপর ফুলের আবাদ করছেন? জানালেন, পাঁচ কানি জায়গার ওপর তিনি ফুলের আবাদ করছেন। তার মতো অনেকেই এখন ফুলের আবাদ করেন। আগে তাদের সংসারে দারিদ্র্য ছিল কিন্তু এখন আর নেই। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন ফুলবনে ঘুরতে। সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত।

 

 

যেভাবে যেতে হবে

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলাচল করে বন্ধন, উত্সব,  আনন্দ ইত্যাদি পরিবহনের বাস। ঢাকার গুলিস্তান থেকে এসব বাস পাঁচ মিনিট পর পর ছেড়ে যায় নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে। অথবা ট্রেনে করে যেতে পারেন নারায়ণগঞ্জে। আপনার বাসে ভাড়া লাগবে ৩৬ থেকে ৫৫ টাকা। চাইলে ট্রেনে কমলাপুর থেকে সরাসরি নারায়ণগঞ্জে যেতে পারেন জনপ্রতি ১৫ টাকা খরচ করে। সেখান থেকে আপনাকে যেতে হবে গুদারা ঘাট। এরপর নদী পার হয়ে টমটম করে যেতে হবে সাবদী বাজার। আর সেখানে গেলেই দেখা পাবেন ফুলের বন।