রায়েরগ্রামে এগারো শহীদের গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও নেই নামফলক

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:০৪

সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের ২৩ তারিখ। ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল ক্যাম্প করতে এসে স্থানীয়ভাবে চালসহ অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে রান্নার আয়োজন করেছিল। ক্যাম্পে রান্নার আয়োজনের মধ্যেই রাজাকারদের সহায়তায় ক্যাম্পে আক্রমণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় হানাদার বাহিনীর সাথে শুরু হয় যুদ্ধ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশালের হরিরামপুর ইউনিয়নের রায়েরগ্রামে এ ঘটনায় সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। পরে স্থানীয়রা মিলে রায়েরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে তাদের দাফন সম্পন্ন করেন। সেই বধ্যভূমির পাশেই কয়েক বছর আগে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের কোনো তালিকা স্থাপন করা হয়নি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এখানকার রায়েরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১০ জন মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ শেষে গফরগাঁও উপজেলার রসুলপুর গ্রামে অবস্থিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিতে ১২ সেপ্টেম্বর নিজেরা ক্যাম্প স্থাপন করে। মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পে যখন খাবার রান্না করছিল সে সময় রসুলপুর গ্রামের কয়েকজন রাজাকার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে খবর দেয় মুক্তিযোদ্ধারা রায়েরগ্রামে ক্যাম্প করেছে। হানাদার বাহিনী এ সময় তিনদিক থেকে রায়েরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্যাম্পটি ঘেরাও করে ব্রাশফায়ার করলে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় আরো ৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয় এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। রাত ১২টার পর স্থানীয় এলাকাবাসী লাশগুলো রায়েরগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গণকবর দেয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন স্থানীয় রায়েরগ্রাম এলাকার বাসিন্দা। তার নাম মোখলেছুর রহমান।

ছেলের শোকে কাতর ৯০ বছর বয়সী শহীদ মোখলেছুর রহমানের মা খতিজা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার বাপজান মেট্রিক পরিক্ষার্থী আছিল। মুক্তিবাহিনীরে খাওয়াইবার গ্যায়া বাবা আমার লাশ অইয়া ফিরছে। আমার বাবার জান গেল দেশও স্বাধীন অইল।

স্থানীয় ইব্রাহিম মিয়া (৬০) ও নিজাম উদ্দিন (৭০) সেদিন সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা বলেন, ওদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না। অনেক কষ্ট করে খাবারের ব্যবস্থা করেও উপোস অবস্থায় দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ হলেন তারা।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, অনেক কষ্ট করে আমি এসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করেছি। তিনি জানান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়-স্বজন ও বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এসব নাম সংগ্রহ করে আমি নিশ্চিত হয়েছি নিহতদের পরিচয়। ত্রিশালের বাইরের ১০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেন, ময়মনসিংহের সদর উপজেলার পরানগঞ্জ গ্রামের গিয়াসউদ্দিন, খলিল উল্যাহ, ময়মনসিংহের সদর উপজেলার চরনিলখিয়া গ্রামের ফয়েজউদ্দিন, আবু বকর সিদ্দিক, আব্দুল খালেক, শামছুদ্দিন, ময়মনসিংহের সদর উপজেলার চরশিথলা গ্রামের ইসহাক, ভালুকা উপজেলার বরাইদ গ্রামের সৈয়দ শামছুদ্দিন, গৌরপুরের আহমদ আলী, ফুলপুরের কালা মিয়া।

স্থানীয় হরিরামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ জানান, শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে এখানকার লোকজন দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের আগে ‘শহীদ স্মৃতি’ শব্দটি যোগ করেছে। সে দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে — রায়েরগ্রাম শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও রায়ের গ্রাম শহীদ স্মৃতি দাখিল মাদ্রাসা। এখানে সরকারিভাবে তেমন কোনো অনুষ্ঠান না হলেও বিশেষ দিবসে পতাকা উত্তোলন ও মুনাজাত করা হয়।