রাণীনগর জয়িতাদের জীবনযুদ্ধের গল্প

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:০১

  আব্দুর রউফ রিপন

 

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য নারী রয়েছে যারা নিজেদের মনোবল, ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী। আর এসব নারীর তৃণমূল পর্যায় থেকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর জীবনযুুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। দেশের এসব অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীদের সমাজের সামনে তুলে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ২০১৩ সাল থেকে সরকার চালু করেছে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ নামক কার্যক্রম। তারই ধারাবাহিকতায় নওগাঁর রাণীনগরে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় আন্তর্জাতিক নারী প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবসে উপজেলার পাঁচ নারীকে জয়িতার পুরস্কার ও সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে।

উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুনের সভাপতিত্বে ও মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খোন্দকার মাক্বামাম মাহমুদার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ আনোয়ার হোসেন হেলাল। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান জারজিস হাসান মিঠু, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফরিদা বেগম, নির্বাচন কর্মকর্তা জায়িদা খাতুন, রাণীনগর শের-এ-বাংলা সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোফাখ্খার হোসেন খান পথিক, রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহুরুল হক, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান পিন্টু প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা বিজয়ী জয়িতাদের হাতে সম্মাননা হিসেবে ক্রেস্ট তুলে দেন।

উপজেলার পাঁচ জয়িতারা হলেন শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী মোছা. চাঁদ আক্তার বানু, সফল জননী মোছা. শিরিনা বেগম, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য মোছা. পান্না বেগম, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী মোছা. আফরোজা বেগম ও নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে মোছা, রোমানা বেওয়া। এছাড়া সফল জননী মোছা. শিরিনা বেগম জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।

শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী জয়িতা মোছা. চাঁদ আক্তার বানু বলেন, খুব কম বয়সে আমাকে বিয়ে দেওয়া হয় এক প্রবাসীর সঙ্গে। স্বামী ও আমার পরিবার কট্টোর ইসলামপন্থি হওয়ার কারণে বিয়ের পর পড়ালেখা একেবারেই বন্ধ হতে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে স্বামীর সহযোগিতায় লুকোচুরি করে পড়ালেখা অব্যাহত রাখি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন লালন করতাম নিজের ভেতরে। যে করেই হোক না কেন আমাকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে হবেই। আর এর জন্য আমাকে প্রতিনিয়তই স্বামীর ও নিজের পরিবারের গালমন্দ শুনতে হয়েছে।

সফল জননী মোছা. শিরিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মধ্যবিত্ত পরিবারে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের পড়ালেখাসহ পুরো পরিবারের খরচ চালানো ছিল আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন একটি বিষয়। ছেলে-মেয়েরা স্বাবলম্বী হওয়ার আগেই স্বামী আমাদের ছেলে চলে যান। এরপর থেকে শুরু হয় আমার সংসারযুদ্ধের অধ্যায়। স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য জমি ও হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে পাঁচটি মেয়ে ও একটি ছেলের পড়ালেখার খরচ যোগানো আমার পক্ষে খুবই দুঃসাধ্য বিষয় ছিল। তবুও হতাশ না হয়ে শত কষ্টেও সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নিতাম। এরপর আস্তে আস্তে মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে চাকরি নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করল।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী জয়িতা মোছা. আফরোজা বেগম বলেন, সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক   প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও জীবন সংগ্রাম করে আর্থিকভাবে সফল হয়েছেন তিনি। এক সময় সংসারে অভাব আর অনটন সব সময় লেগেই থাকত। দিনমজুর স্বামীর একক আয়ে সংসারের কোনো সদস্যের প্রয়োজন পুরোটা মিটত না। দিনের কোনো না কোনো বেলা তাদের না খেয়ে থাকতে হত। এমতাবস্থায় কিছু একটা করতে হবে সিদ্ধান্ত নেন আফরোজা। এরপর মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের আইজিএ প্রকল্প (আয়বর্ধক প্রকল্প) থেকে বিউটিফিকেশান ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একটি বিউটি পার্লার খুলেছেন।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা জয়িতা মোছা. পান্না বেগম বলেন নিঠুর গরিব পরিবারের আমার জন্ম। অভাব-অনটন ছিল আমার জীবনের নিত্যসঙ্গী। অভাবের সংসারে বেশিদূর পর্যন্ত পড়ালেখা করা ভাগ্যে জোটেনি। এরপর বাবা-মা আমাকে বিয়ে দেয় এক দিনমজুরের সঙ্গে। সেখানে গিয়েও হাড়ভাঙা খাটুনি করা শুরু হলো। একপর্যায়ে আনসার-ভিডিপির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এরপর থেকে একটু পরিবর্তন আসতে শুরু করে আমার পরিবারে।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জয়িতা মোছা. রোমানা বেওয়া বলেন, বিয়ের পর থেকে স্বামী আর স্বামীর পরিবারের সদস্যদের যৌতুকের নির্যাতন লেগেই থাকত। আমি ছিলাম গরিব পরিবারের মেয়ে। আমার পরিবার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে আমার স্বামীকে উপঢৌকন দেওয়ার জন্য। তবুও আমার স্বামীর মন ভরত না। আমার ওপর নির্যাতন চলতই। তবুও আমি আমার সন্তানদের দেখে চেয়ে সেই সব নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে যেতাম।