মাহবুব শরীফ
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যা মুখোমুখি হচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন না যে, তাদের আদরের শিশুটিকে নিয়ে কোথায় যাবেন, কী করবেন? এমনকি চিকিত্সা দিতে গিয়েও ঘুরছেন বিভিন্ন ডাক্তারেদের দ্বারে দ্বারে। যদিও বিশ্ব জুড়ে অটিজম নামক সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করছে অসংখ্য মানুষ।
সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের এ সমস্যার চিত্র ভিন্ন নয়। অটিজমে আক্রান্তদের সমস্যা এমন যে, যে কোনো একটি সমস্যা সমাধান করলে হচ্ছে না। এর মানে হলো—প্রত্যেক অটিজম আক্রান্তদের সমস্যা আলাদা আলাদা। একজনের সমস্যার সঙ্গে অন্য আরেক জনের সমস্যার কোনো মিল পাওয়া যায় না। এমন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তাদের কীভাবে স্বাভাবিক মানুষের কাতারে আনা যায় তা নিয়ে কাজ করছে দেশীয় স্বেচ্ছসেবী প্রতিষ্ঠান ‘মুক্তডানা’।
মুক্তডানা অটিজকে আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করছে। যখন বাবা-মা অনুপস্থিত থাকলে তাদের অবস্থা কী হবে? তাদের সহায়তা কে করবে? তাদেরকে কেউ সহযোগিতা করতে গেলে তা পারবে কি না? এ বিষয়গুলো মাথায় নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে মুক্তডানা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মুক্তডানার মহাসচিব এবং বেসিসের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফারহানা এ রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, অটিজমে আক্রান্তরা একজন থেকে অন্যজন সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকে। এদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয় অনেক সময় নিয়ে। যখন ওই শিশুরা বড়ো হবে বা যখন ওই শিশুদের বাবা-মা থাকবেন না, তখন তাদের দেখভাল করাটা তত সহজ হবে না। হঠাত্ করে কেউ এসেই তাদের দেখভাল করতে পারবে না। এজন্য তাদের সমস্যা সম্পর্কে আগে জানতে হবে। তাদের চিকিত্সার সময়ও ঠিক একই নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন রয়েছে। এ বিশাল সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে মুক্তডানা।
তিনি আরো জানান, মুক্তডানার তৈরি মডেল অনুসরণ করলে অটিজমে আক্রন্ত শিশুরা যখন ১৮+ বয়সের হবে তখন স্বাভাবিক মানুষের মাঝে চলাফেরা করতে পারবে। তাদের এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে তাদের আচরণে কেউ বিরক্ত হবে না। এর উদাহরণ হিসেবে মুক্তডানা গত মাসে ঢাকার বাইরে একটি আনন্দভ্রমণের আয়োজন করে, যা শুধুই একটা ভ্রমণ বললে ভুল হবে। মুক্তডানার সেবাপ্রাপ্তরা এমন কোনো আচরণ করেননি, যা অন্য কারো অভিযোগের কারণ হয়। অটিজমে আক্রান্ত এই মানুষদের সবার মধ্যেই হাইপার অ্যাকটিভিটি, আচরণগত সমস্যা আছে। তাদের অন্য কাজের পাশাপাশি এই ভ্রমণের সব বিষয় সম্পর্কে জানানো ও প্রশিক্ষিত করা হয় প্রায় দুই মাস ধরে।
ফারহানা এ রহমান জানান, ওই বিমান ভ্রমণে ছিল ৩০ জনের একটি দল। এর মধ্যে ছয়জন অটিস্টিক প্রাপ্তবয়স্ক। সঙ্গে তাদের পরিবার ও শিক্ষকমণ্ডলী। সাধারণ মানুষের মধ্যে এদের সম্পর্কে ভয় ও কৌতূহল দুইই আছে। যেহেতু জনপরিসরে (পাবলিক প্লেস) এদের খুবই সংগত কারণে নেওয়া হয় না। তাই আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ যাদের এমন পারিবারিক সদস্য নেই, এদের সম্পর্কে তাদের জানার সুযোগ ও সীমিত।
মুক্তডানা নিয়ে আগামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে ফারহানা এ রহমানে বলেন, ‘মুক্তডানা হলো একটি আইডিয়া মডেল। আমরা ২০১৯ সালের জুন মাস থেকে কাজ করছি। আপাতত ১৬টি শিশু নিয়ে চলছে আমাদের গবেষণা। ঢাকার নাখালপাড়াতে একটি বাড়ি জুড়ে থাকে ওরা। তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা বেডরুম, বারান্দা ও ওয়াস রুম। বাড়িটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ওই শিশুরা হাঁটাচলা করলেও কোনো সমস্যা না হয়। বাড়িটির ছাদের চারদিকে উঁচু দেওয়াল দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার জন্য। ওদের এক্টিভিটিজ ফলোয়াপ করা ও নিরাপত্তার জন্য ২৪/৭ সার্ভেলেন্স ক্যামেরার আওতায় রাখা হচ্ছে। ওই শিশুদের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে ইতিমধ্যে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা আমাদের জানাচ্ছে। আইডিয়া নিয়ে তারাও এমন সেবা দিতে চায় অটিজম আক্রান্তদের। একটি বিষয় বলে রাখি, আমরা স্বনির্ভর, অটিজম সমস্যার সমাধানে আইডিয়া মডেল নিয়ে কাজ করছি। আমরা অটিজম আক্রান্তদের দেখভাল করার পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের একটি সমাধান নিয়ে কাজ করছি। আমরা এমন একটি আইডিয়া মডেল তৈরি করছি যে আগামীদিনে অটিজম আক্রান্তদের নিয়ে আর কোনো বাবা-মাকে চিন্তা করতে হবে না।’
