বাংলায় একটি প্রবাদ রহিয়াছে—শিয়ালের নিকট মুরগি বর্গা দেওয়া। ফেসবুকের নিকট ব্যক্তিগত তথ্য বর্গা দেওয়ার সহিত ওই প্রবাদের খুব বেশি পার্থক্য নাই। ফেসবুকের ঝুলি হইতে গ্রাহকদের তথ্যফাঁসের সর্বশেষ বিড়ালটি সম্প্রতি উদ্ঘাটিত করিয়াছে নিউইয়র্ক টাইমস। এই বত্সর মার্চে ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ একদফা ক্ষমা চাহিয়াছিলেন কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি তথা তথ্যচুরির অভিযোগে। তিনি তখন বলিয়াছিলেন, ফেসবুক পরিস্থিতির শিকার। তথ্যচুরির ভুল আর হইবে না। তবে সেইসময় যেইটুকু তথ্যফাঁসের কথা প্রকাশিত হইয়াছিল, বিশ্লেষকদের মতে তাহা ছিল তথ্যচুরির বিপুল হিমশৈলের সামান্য চূড়া মাত্র। এইবার নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ব্যক্তিগত সকল ধরনের তথ্য মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যামাজনসহ ১৫০টিরও বেশি সংস্থার নিকট বিক্রয় করিয়াছে। অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করিয়াছে ফেসবুক।
ফেসবুক হইতে তথ্য চুরি হয়—এই অভিযোগটি নূতন নহে। সেই ২০১১ সালের এপ্রিলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস অভিযোগ করিয়াছিল ফেসবুকের তথ্যচুরির ব্যাপারে। তারপর অনেকবার ইহা লইয়া শোরগোল হয়। কিছুদিন পূর্বে ফেসবুককর্মী স্যান্ডি প্যারাকাইলাস জানাইয়াছিলেন যে, কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ছাড়াও আরো অনেক কোম্পানি ফেসবুক হইতে তথ্য চুরি করিয়া থাকে। অন্যদিকে এডওয়ার্ড স্নোডেন ইতিপূর্বে জানাইয়াছেন যে, কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রয় করিয়াই রোজগার করে ফেসবুক। ফেসবুক ব্যবহারকারী যেই তথ্য তাহার পোস্টে দেন, তাহা হইতে অনেক তথ্য ফেসবুক বাণিজ্যিক কারণে তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলিয়া দেয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে, গ্রাহক-তথ্যফাঁসের ক্ষেত্রে এযাবত্ যত ঘটনার কথা সামনে আসিয়াছে, তাহার মধ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাটিই সব চাইতে বৃহত্। প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, রয়্যাল ব্যাঙ্ক অফ কানাডা, নেটফ্লিক্স এবং স্পটিফাই ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ‘মেসেজ’ দেখিতে পারিত এবং তাহা তাহাদের ভাবমূর্তির পক্ষে ‘খারাপ’ হইলে গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই ‘ডিলিট’ও করিয়া দিতে পারিত। মাইক্রোসফট-এর সার্চ ইঞ্জিন ‘বিং’ এবং রুশ সার্চ ইঞ্জিন ‘ইয়ানডেক্স’ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ‘ফ্রেন্ডলিস্টে’ থাকা ব্যক্তিদের নাম এবং তাহাদের প্রোফাইলও দেখিতে পারিত। এই অধিকার অ্যামাজনের হাতেও তুলিয়া দিয়াছিল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি। অ্যাপলের নিকট অবাধ অধিকার ছিল সমস্ত গ্রাহকের ফোন নম্বর এবং ক্যালেন্ডার এন্ট্রি দেখিয়া নেওয়ার। সনি দেখিতে পাইত সমস্ত গ্রাহকের ইমেইল অ্যাড্রেস।
অনেকেই মনে করেন, ফেসবুক আসলে তথ্যচুরির ঘটনায় বিস্ময়ের কিছু নাই। মুশকিল হইল, ফেসবুক তথ্যের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয়, অর্থাত্ শিয়াল হইয়া সে এই ঘোষণা দেয় যে, তাহার নিকট ব্যক্তিগত-তথ্য নামের মুরগিখানি নিরাপদে রাখা যাইবে। কিন্তু শেষাবধি সেই শর্ত ফেসবুক গোপনে বরখেলাপ করে। স্পষ্টতই ইহা ফেসবুকের চরম অসততা। সারা বিশ্বের প্রায় ২২৭ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। গ্রাহকের সংখ্যার দিক হইতে ফেসবুক এই বিশ্বের সবচাইতে বড় প্লাটফরম। সুতরাং এই অসততা ভয়ঙ্কর। তবে সাধারণ মানুষকেও বুঝিতে হইবে, কেবল ফেসবুক নহে, ইন্টারনেটের জগতে প্রদান করা কোনো গোপন তথ্যই গোপন থাকে না শেষাবধি। সুতরাং কতটুকু তথ্য প্রকাশযোগ্য তাহা বুঝিয়া লইতে হইবে সাধারণ ব্যবহারকারীকেই।
