গত এক দশকে আমিষের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য লাভ করিয়াছে। বর্তমানে আমরা মাংস উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাংসের চাহিদা যেখানে ৭২ লক্ষ ১৪ হাজার টন, সেখানে উত্পাদিত হইতেছে ৭২ লক্ষ ৬০ হাজার টন। কিন্তু আমিষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ডিম ও দুধ উত্পাদনে আমারা এখনো পিছাইয়া আছি। এই পিছাইয়া থাকার অর্থ ডিম উত্পাদন বাড়িতেছে না এমন নহে, বরং জনসংখ্যা ও উপার্জন ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে চাহিদা অনুযায়ী তাহা এখনো অপর্যাপ্ত। সমপ্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে আমাদের ডিম উত্পাদনে সেই ঘাটতির কথা বলা হইয়াছে। বলা হইয়াছে যে, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের চাহিদার তুলনায় উত্পাদিত ডিমের বার্ষিক ঘাটতি দাঁড়াইবে ১৫০ কোটি পিস। তাই এখন হইতেই সরকার ও উদ্যোক্তাদের এই ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। ডিম উত্পাদন বৃদ্ধিতে জাত উন্নয়নসহ বাড়াইতে হইবে বিনিয়োগের পরিধি।
প্রাণিম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবত্সরে ডিমের উত্পাদন ছিল ৫৭৪ কোটি ২৪ লাখ পিস। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবত্সরে ইহার পরিমাণ এক হাজার ৫৫২ কোটি পিস। অর্থাত্ গত এক দশকে ডিমের উত্পাদন ব্যাপক বাড়িলেও বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে তাহা এখনো পর্যাপ্ত নহে। কেননা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণেও বাংলাদেশে ডিমের চাহিদা ক্রমশ বাড়িতেছে। তাহাছাড়া সুস্থভাবে জীবনযাপনের জন্য একজন মানুষকে বত্সরে ডিম খাইতে হয় ১০৪টি। সেখানে আমাদের মাথাপিছু প্রাপ্যতা ৯৫টি। ব্যবধান খুব বেশি না হইলেও আমাদের ডিম খাইবার প্রবণতার মাত্রা সন্তোষজনক নহে। কেননা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বার্ষিক মাথাপিছু ডিম গ্রহণের পরিমাণ দুই শতাধিক। সেই হিসাবে আমাদের ডিম উত্পাদনে ঘাটতি রহিয়াছে নিঃসন্দেহে।
আমরা জানি, একসময় আমাদের দেশে পবিত্র ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর সংকট ছিল। প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বেশি। তবে নানা কারণে প্রতিবেশী দেশের গরু রফতানি যখন বন্ধ হইয়া গেল, তখন আমাদের কৃষক ও খামারিরা দেশেই গরুর উত্পাদন বাড়াইতে ও মোটাতাজাকরণে সচেষ্ট হইলেন। ইহাতে একের পর এক বৃদ্ধি পাইতে থাকিল খামারের সংখ্যা। অনেক শিক্ষিত তরুণও এই পেশায় আত্মনিয়োগ করিলেন। ফলে মাত্র কয়েক বত্সরেই আমরা কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করিলাম। এইভাবে আমাদের আগের সংকটটা শাপে বর হইল। এখন কোরবানির সময় হাট-বাজারগুলিতে দেশীয় গরুর সরবরাহ এতটাই বেশি থাকে যে, ফার্মার ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা বিদেশি গরুর চালান যাহাতে আসিতে না পারে, সেইজন্য সচেষ্ট থাকি। অনুরূপভাবে ডিম উত্পাদনেও আমাদের স্বনির্ভর ও সফল হইতে হইবে। এইজন্য এই ব্যাপারে বিশেষ করিয়া তরুণ শিক্ষিত উদ্যোক্তাদের বেশি করিয়া আগাইয়া আসা প্রয়োজন। আর সরকার তাহাদের কিভাবে প্রণোদনা দিতে পারে, প্রয়োজন তাহা লইয়াও চিন্তাভাবনা করা।
