lপূর্ব প্রকাশের পর
ওয়ার্ল্ড আলমানেকার তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে পঞ্চাশ হাজারের অধিক তাবলিগের সক্রীয় লোক রয়েছেন যারা নিয়মিত তাবলিগের ছয় উসুল নিয়ে কাজ করেন। অর্থাত্ ছয় উসুলের আলোকে নিজে চলতে চান এবং অপর মুসলিমকেও এ কাফেলায় সংযুক্ত করতে চান। আশির দশকে ডেটট্রয়েট থেকে শুরু হওয়া তাবলিগের এ দাওয়াতি কার্যক্রম এখন প্রায় সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃত। প্রায় সারা বছরই তাদের আঞ্চলিক ইজতেমা হয়ে থাকে। প্রতি বছর একবার কেন্দ্রীয় ইজতেমা হয়। গত কয়েক বছর যাবত ফিলেডেলফিয়ায় এ বিশাল ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে যাতে সারা আমেরিকা হতে তাবলিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলমানরা অংশগ্রহণ করছেন। অবশ্য এ তাবলিগের কার্যক্রমের মধ্যে কিছু কিছু গবেষক যেমন জনও ওয়ালকার ও জোসেফ ফেডিলা তালেবান বা সন্ত্রাসীদের সংযোগের অভিযোগ তুলেছেন। তবে অধিকাংশ গবেষক তাদের মতের সঙ্গে একমত নন। ইউনাইটেড স্টেট ইনস্টিটিউট অব পিস তাবলিগের ব্যাপারে বড়ো একটি গবেষণাপত্র তাদের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করেছে। তাতে তারা কোনো কোনো গবেষক কর্তৃক তাবলিগকে ‘গেটওয়ে অব টেররিজম’ বললেও এ দাওয়াতি কার্যক্রমটি কেবল তাদের ছয় উসুলেই সীমাবদ্ধ বলে স্বীকার করেছেন। তারা এ গবেষণাপত্রে আরো উল্লেখ করেছেন, তাবলিগ স্পষ্টতই রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখে, সব দেশের বর্তমান সরকার কাঠামোকে সম্মান বা সমর্থন করে। আমেরিকার মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলো বিভিন্ন দেশীয়, আঞ্চলিক, সামাজিক সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত। এ কারণে আমেরিকায় কোনো মসজিদ সালাফী, তাবলিগি, বাংলাদেশি, চরমোনাই, ফুলতলী ইত্যাদি পরিচয়ে পরিচিত। এতে অবশ্য নামাজসহ অন্যান্য কার্যক্রমে সমস্যা হয় না। তবে দর্শনগত কিছু মতবিরোধ তো আছেই। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশ এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের মসজিদগুলোর পরিচালনায় সামাজিক নেতৃত্বের প্রাধান্য থাকে। আমেরিকায় কিছুটা এর ব্যতিক্রম। তাবলিগ যেমন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় তেমনি এতদিন নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের কথা শুনা যায়নি। অবশ্য ইদানীং নেতৃত্বের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে এবং টঙ্গীর আন্তর্জাতিক ইজতেমাকে যেভাবে দুই ভাগ করা হয়েছে এর ঢেউ সুদূর আমেরিকাতে লেগেছে। সারা বিশ্বের তালিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তারা মূলত উপমহাদেশের তিন দেশকে তিনভাবে পরিচিত করে থাকেন। ১. দিল্লির নিযামুদ্দিন মারাকাজ, মাওলানা সা‘দ কান্দলভীর নেতৃত্বে যা চলমান। ২. রাইউইন্ড লাহোর কর্তৃক পরিচালিত গ্রুপ আর ৩. বাংলাদেশকে ইজতেমার জন্যে ব্যাপকভাবে চিনেন। সারা বিশ্বের সব গ্রুপ এ ইজতেমায় সমানভাবে অংশ নেন। অবশ্য বর্তমানে ভারতেই তাবলিগের দুই গ্রুপ ব্যাপকভাবে সক্রীয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভক্তি সারা বিশ্বের তাবলিগের ন্যায় আমেরিকার তাবলিগেও বিভক্তি এনেছে তবে তা উপমহাদেশের ন্যায় এতটা প্রকট নয়।
১৯২৬ সালে মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভীর নেতৃত্বে যে তাবলিগের শুরু হয়েছিল তা ছিল মূলত সংস্কার আন্দোলন। বিশিষ্ট গবেষক ও আইটিভি ইউএসএ এর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘তাবলিগ ছয় উসুলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি দাওয়াতি কাফেলা। নিছক দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজনীতি ও নেতৃত্বের কোনো লোভ-লালসার ব্যাপার ছিল না, এখনো নেই বলে আমি মনে করি। আমরা আশা করি তাবলিগের মৌল ছয় উসুলের কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের সমস্যাটি অচিরেই মিটে যাবে’। আমেরিকার যারা তাবলিগের সঙ্গে জড়িত আছে তাদের অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। এক পার্সেন্ট মুসলমান হয়েও স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের যে অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে এর প্রতি অবশ্যই সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। এমন কোনো কার্যক্রম করা যাবে না যা বিতর্কের জন্ম দেয়। আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী যুবকদের দিনের পথে রাখতে হবে, তবে অবশ্যই আমেরিকার মূল শিক্ষা ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত হবে না। আমি আমেরিকায় থাকার সময় পর্যবেক্ষণ করেছি, অনেক পিতা-মাতার মধ্যে ধর্মীয় আবেগ এত বেশি যে তাদের সন্তানকে কেবল দিনি শিক্ষা দেওয়ার জন্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত বা দক্ষিণ আফ্রিকায় এমনকি আরবের কোনো কোনো দেশে প্রেরণ করেন। মনে রাখতে হবে দুনিয়াতে সত্ভাবে হালাল রুজি অর্জনের চেষ্টাও ছাওয়াব লাভের অন্যতম শর্ত। আমেরিকান শিক্ষা ধারা থেকে মুসলিম যুবকদের বিচ্ছিন্ন করা উচিত হবে না। মনে রাখতে হবে ভালো শিক্ষিত সন্তান ভালোভাবে আমেরিকাকেও প্রতিনিধিত্ব করবে, ইসলামেরও প্রতিনিধিত্ব করবে। তাবলিগ জামাতকে বাঁচাতে হলে বর্তমান পৃথিবীর উপযোগী আরো অনেক পলিসি তাবলিগের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। (সমাপ্ত)
লেখক : ইন্টারফেইথ গবেষক ও অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
