নগর ভ্রমণ করে গৌর এল ঘরে।
গৌর এল ঘরে আমার নিতাই এল ঘরে।।
ধেয়ে গিয়ে শচীমাতা গৌর কোলে করে।
ধুলা ঝেড়ে শচীমাতা গৌর কোলে করে।।
নরহরি বসাইল রত্নাসন পরে।
নানাবিধ সেবা করে শ্রান্তি দূর করে।।
মুখ পদ পাখালিল সুশীতল নীরে।
শচীমাতা আনি দিল ক্ষীর ননী সরে।।
নরহরি যতন করি খাওয়ায় গৌরেরে।
মুখ পাখালিল দিয়া সুশীতল নীরে।।
ধীরে ধীরে মোছাইল পাতল চিরে।
অবশেষে বাটি দিল সব পরিকরে।।
অবশেষে পেয়ে সবে নাচে প্রেমভরে।
প্রেমানন্দে সবে মিলি আলিঙ্গন করে।।
এই কৃপা কর মোরে শ্রী গৌরাঙ্গ হরি।
নিত্যানন্দে সঙ্গে যেন তোমা না পাসরি।।
তুমি আর নিত্যানন্দ বিহরিবে যথা।
এই করো জন্মে জন্মে ভৃত্য হই তথা।।
জয় গৌর হরিবল
নগর সংকীর্তন ধর্মের কাহিনি চিত্রায়িত করে নগর প্রদক্ষিণ করা।
সকাল থেকে চলছে নগর সংকীর্তনের প্রস্তুতি। ঢাকা থেকে মেকআপ ম্যান আনা হয়েছে। যিনি সাজিয়ে তুলবেন নানা পৌরাণিক চরিত্র। তপন কুমার নাগ আশি ছাড়িয়েছেন। এখনো তার মেকআপের কাজ করেই সংসার চলে। ঢাকার শাঁখারি বাজারে সাজঘরের বান্ধা মেকআপ ম্যন। নানা পোশাক-আশাকের সঙ্গে তাকেও ভাড়ায় নেওয়া হয় সাজসজ্জার কাজ করতে। এই নিয়ে সাভারের সাধুর মন্দিরের সংকীর্তন ও কীর্তন উত্সবে কয়েকবার আশা হলো তপন কুমারের। একজন করে আসছে সামনের চেয়ারে বসছে। সাজ সম্পন্ন হলে উঠে যাচ্ছে, আবার আরো একজন বসছে। এখন সাজসজ্জা করছে জগাই ও মাধাই। জগাই সাজছে সৌরভ আর মাধাই সাজছে কার্তিক পাল। জগাই মাধাই হিন্দুধর্মের ভিলেন চরিত্র। কাঁধে মদের কলস নিয়ে পথ চলেন। দুই ভাই দিন-রাত নেশা করে বুঁদ হয়ে থাকেন আর ফন্দি করেন মানুষকে কীভাবে বিপথে নেয়া যায়।
কানাই-বলাইয়ের কানাই অর্ণব সাহা আর বলাই মৃদুল সাহা। কানাই কৃষ্ণ হিন্দুধর্মের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র। আর বলাই কৃষ্ণের বড়ো ভাই বলরাম। হনুমান সেজেছে গৌতম, রামায়ণের সেই লঙ্কাকাণ্ডের হোতা বা লঙ্কাপুরী থেকে সীতাকে উদ্ধারকাজের অগ্রসৈনিক হনুমান, যিনি কিনা গদা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেন।
কৃষ্ণ সেজেছে বাঁধন, মেয়ে হলেও ওকে চমত্কার মানিয়ে গেছে। শিব আর পার্বতী হরিহরণ আর নিশা। শিব আর পার্বতী হিন্দুদের যে কোনো মিছিল, র্যালি, সংকীর্তনের কমন চরিত্র। সাপ হাতে শিব আর পিছে তার পার্বতী। ইতিহাসের রামায়ণের চরিত্র রাম সেজেছে নরকোশ আর লক্ষণ উত্তম কুমার সাগর। রাধার প্রেমে মাতোয়ারা গৌরহরি সেজেছে তুষ্ট, আর গৌরের প্রিয় সখা নিতাই সেজেছে চিত্রদ্বীপ। পিতলের ঘটি হাতে লম্বা সাদা দাড়ি সমেত লোকনাথ সেজেছে লিটন। ছোট্ট মেয়ে রিচি শাহ সেজেছে রাধা। ছোট্ট মেয়ে শ্যামা সাহা সেজেছে কৃষ্ণ, পার্বতী সেজেছে বৃন্দাবন, অসুর সেজেছে যুবরাজ।
সাজ সম্পন্ন হলে র্যালি বের হয়। র্যালির অগ্রভাগে থাকে সাধুবাবার বাঁধাই করা একটি ছবি। তার পেছনে মন্দিরে স্থাপিত পিতলের তৈরি কয়েকটি কৃষ্ণমূর্তি মাথায় থাকে কয়েকজনের। পেছনে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ। তার পেছনে একের পর এক সারি বেঁধে হেঁটে চলে পৌরাণিক চরিত্রসমূহ।
সাধুর আখড়া থেকে বের হয়ে নামার বাজার ছাড়িয়ে ঘোষপাড়া দিয়ে প্রবেশ করে। মধ্যপাড়া হয়ে পালপাড়া গিয়ে বিরতির পর আবার র্যালিটি ফিরতি পথ ধরে। সেই আগের মতোই পরিবেশনাসহ সাধুর আখড়ায় এসে শেষ হয় র্যালি।
তারা শুধু হেঁটে যান না। পথিমধ্যে পৌরাণিক চরিত্রগুলোর নানা দিক চিত্রায়িত করে চলেন। সঙ্গে ঢোল, কাড়া, মন্দিরা যোগে বাদকদল বাজিয়ে চলেন। শহরের মূল রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ঘরের বৌ-ঝি তো বটেই। আবাল বৃদ্ধ বনিতা রাস্তার দুইপাশে দাঁড়িয়ে সংকীর্তন দেখে। ভক্তকুল মুড়ি-মুড়কি বা বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে বসে থাকে যদি কোনো পৌরাণিক চরিত্র তার খাবার খায়, তাহলেই মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে। পথিমধ্যে পড়া মন্দিরের আঙিনায় লোকসমাগম একটু বেশি হয়, তখন দল বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে তাদের পরিবেশনা প্রদর্শন করেন। শহরের শেষ মাথায় মন্দিরে গিয়ে ক্ষণকাল সময় বিশ্রাম নিয়ে শুরু হয় ফিরতি সংকীর্তনের পালা। সাধুর আখড়ায় ফিরতে ফিরতে বিকাল। কৃষ্ণ মাথে সখাত্রয় সাধুর মন্দিরের চারপাশে চৌদ্দ মাদল সঙ্গে নিয়ে সাত চক্কর দিয়ে কৃষ্ণমূর্তি মন্দিরে প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সংকীর্তন।
নগর সংকীর্তনকে এখানে বলা হয় চৌদ্দ মাতাল। চৌদ্দ মাতালের শেকড় অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল—আসলে এর আদি নাম ছিল চৌদ্দ মাদল। সাধুবাবা প্রতি বছর সংকীর্তনের সময় মন্দিরে থাকা ৪টি কৃষ্ণমূর্তি মাথায় করে বহন করাতেন। যেগুলো থাকত সংকীর্তনের সম্মুখভাগে। সেগুলো শহর ঘুরে মন্দির প্রাঙ্গণে এসে চৌদ্দ মাদলের বাদ্যসহ পাকুড় গাছের চারদিকে সাত চক্কর দিয়ে স্ব-স্থানে স্থাপন করা হতো। এখনো সেই প্রচলন চালু আছে। সেই সঙ্গে চালু আছে সংকীর্তনে অংশ নেওয়া সনাতন ধর্মের নানা পৌরাণিক চরিত্রের পরিবেশনা।
অন্যদিকে আশ্রমের মাঠে বসে মেলা। মাটি, কাঠ, বেত, বাঁশের তৈরি নানা পসরা নিয়ে বসে দোকানিরা। আশ্রমের অন্দরমহলে সারাদিন চলে সবজি কাটা, বাটনা বাটা আর রান্নার কাজ। বেসুমার রান্না হয় আশ্রমে, সারা সাভার তো বটেই মানিকগঞ্জ, ধামরাই, ঢাকা, কেরানীগঞ্জ থেকে ভক্তকুল আসে নগর সংকীর্তনে অংশ নিতে।
