হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উত্সব সরস্বতী পূজা আগামী ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন ধার্য রয়েছে ৩০ জানুয়ারি। তাই ভোটের তারিখ পেছানোর দাবিতে সোচ্চার হিন্দু সম্প্রদায়। সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরা ভোটের তারিখ পেছানোর দাবিতে স্মারকলিপি, ঘেরাও ও বিক্ষোভ সমাবেশের পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতে রিটও করেছেন। এই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে ডাকসুসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। নির্বাচন পেছানোর নির্দেশনা চেয়ে করা রিট খারিজের পর গতকাল বৃহস্পতিবার চেম্বার আদালতে আপিল করেছেন রিটকারী অশোক কুমার ঘোষ। রবিবার এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সরস্বতী পূজা পালনের জন্য ভোট পেছানোর দাবি জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম, বিএনপির ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদপ্রার্থী ইশরাক হোসেন ও উত্তর সিটির মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সমবেদনা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
সরস্বতী পূজার জন্য ভোট পেছানোর দাবি জানিয়ে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। আমি চাই না সরস্বতী পূজার দিন নির্বাচন হোক। পূজার কথা স্মরণ রেখে নির্বাচন পেছানো হোক, এই দাবি করছি।’ গতকাল ইত্তেফাককে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে সব ধর্মের লোক বাস করে, সবারই উত্সব পালনের অধিকার রয়েছে। আমি অবশ্যই মনে করি, সরস্বতী পূজার কারণে যদি নির্বাচন পেছানোর দরকার হয়, সেটা করতে হবে। আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি জানাচ্ছি, যদি সম্ভব হয় তাহলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দিন।’
ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বুধবার শ্যামপুর থানাধীন দোলাইরপাড় উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে গণসংযোগ ও প্রচারণা শুরুর আগে সরস্বতী পূজার দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আসলে আমি দুঃখিত, বিষয়টি কেন বা কীভাবে হয়েছে। আমি যতদূর জেনেছি, ইলেকশন কমিশন আলোচনা করেছিল। পঞ্জিকা অনুযায়ী এটা হয়তো ভুল হয়ে গেছে। তাদের (হিন্দু সম্প্রদায়) প্রতি আমার গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা রয়েছে। তবে যেহেতু নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ রয়েছে, প্রার্থী হিসেবে আমাদের গণসংযোগ চালিয়ে যেতে হবে। আমি আশা করব, সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।’
বিএনপির দক্ষিণের মেয়র পদপ্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজার কারণে সিটি নির্বাচন অবশ্যই পেছানো উচিত। আমরা মুসলমান, আমাদের ঈদের দিন যদি ভোট গ্রহণ হতো, তাহলে আমরাও চাইতাম ভোট পেছানো হোক। তাই আমি মনে করি, অবশ্যই ভোট পেছানো উচিত।’
বিএনপির উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘সরকার আগামী ৩০ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার দিনে ভোট গ্রহণের দিন রেখে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। আমরা মনে করি, তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। উত্সবমুখর পূজা উদ্যাপনের স্বার্থে আমরা এই নির্বাচনের সময় পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, আগামী ২৯ জানুয়ারি বুধবার দুপুরবেলা শ্রীপঞ্চমী তিথি শুরু হবে এবং ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোটের দিন সকালবেলা বিদ্যাদেবী সরস্বতীর পূজা হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বন ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে তিথি ও ক্ষণ গণনার মাধ্যমে। তাছাড়া এই পূজার ক্ষেত্রে পূজার্থীদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। আর পূজা তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই হয়। তারা ভোট দেবে, নাকি পূজা করবে? কেননা, বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটের আগের দিনই কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে নেবে। তাই পূজার দিন যদি ভোট হয়, দেশের বাইরে কী বার্তা যাবে? কেননা, সংখ্যালঘু আড়াই কোটি হিন্দু সম্প্রদায়ের এটা তো ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. আলমগীর বলেন, ‘আন্দোলন যারা করছে, তারা বয়সে নবীন। তারা হয়তো কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে করছে। আমার ধারণা, কয়েক দিনের মধ্যে তারা বুঝে যাবে যে এটা ঠিক হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, নির্বাচন ও পূজা দুটোই ‘পবিত্র’ কাজ। দুই সিটির ভোটের জন্য ৩০ জানুয়ারিই উপযুক্ত সময়। এ তারিখ আগানো বা পেছানোর সুযোগ নেই।
