পরম সুখ ও প্রশান্তি হলো ঘুম। অথচ অনেক শিশুর জন্য এই ঘুম হতে পারে মৃত্যুর পরোয়ানা। প্রতি বছর ৭ হাজারের বেশি শিশু আমেরিকায় মারা যায় ঘুমের মধ্যে। এ রোগের নাম ‘সাডেন্ ইনফ্যান্ট ডেথ্ সিনেড্রাম’—শিশু শয্যায় মৃত্যু। এই রোগের কারণ এখনো অজানা। কোনো কোনো গবেষকের ধারণা স্নায়ুতন্ত্রের বাড়ন ও বিকাশে বিলম্ব হলে এমন সমস্যা হতে পারে। অনেকের ধারণা এর মূলে রয়েছে মগজের এমন কোনো অস্বাভাবিককতা যা এখনো রহস্য। ঘুমন্ত শিশুটি কেবল শ্বাসক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। আর অবিলম্বে না জাগালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পৃথিবীর সর্বত্র যে এমন হতভাগ্য শিশুদের পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে তা নয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ ডিসওর্ডারস্ সেন্টারে রয়েছে ভালো ব্যবস্থা। শয্যায় মৃত্যুর সম্ভাবনা এমন শিশুর হূত্স্পন্দন হার, শ্বাসক্রিয়া, রক্তের অক্সিজেন মান, অনবরত তদারকি করে পলিসমনোগ্রাফ। হোম মনিটার এবং রেসপিরেটরি স্টিমুলেট এদের জীবনের প্রথম ঝুঁকি অতিক্রমে সাহায্য করে। নিদ্রার জৌরক ভিত্তি সম্বন্ধে খুব কমই জানেন বিজ্ঞানীরা। শেক্সপিয়র একে বলেছেন, “nature’s soft nursl”। দীর্ঘদিন ধরে নিদ্রাকে চেতনার ঘাটতির ফল হিসেবে মনে করা হতো। আধুনিক বিজ্ঞান চিহ্নিত করেছে যে নিদ্রা কোনো নিরেস্ট প্রক্রিয়া নয় কোনও ভাবেই। কেউ জাগ্রত ও সজাগ থাকলে যেমন ঘুমের সময়ও মগজ বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয় থাকে। বিজ্ঞানীরা নিদ্রার রহস্য অনুসন্ধান করেছেন, তবে একটি তথ্য সত্য; মানুষ জীবন কালের এক তৃতীয়াংশ ঘুমিয়ে কাটায়। নিদ্রার চক্র আবর্তিত হয় অবিরাম: মগজ কখনো বিশ্রাম নেয় না। যত শান্ত হয়েই বসে থাকি আমরা, কিংবা ঘুমিয়েও থাকি কখনো মগজ বিশ্রাম নেয় না। সারারাত ধরে মগজ নিয়ন্ত্রণ করে চলে শ্বাসক্রিয়া, পরিপাক, হূত্স্পন্দনহার এবং কিছুটা পরিবেশকেও নিয়ন্ত্রণ করে। হরহামেশা যেসব গোলমাল হয় এতে সচকিত হওয়া নয়, রাতে দুম করে লাফ দিয়ে উঠবেন না। এসব ব্যাপার বজায় রাখা ছাড়াও, আমরা যখন ঘুমাই, মগজ তখন পাঁচটি কর্মচক্রে ঘুরে ঘুরে চলে। এই চক্রগুলোতে কী রয়েছে? মগজের নিউরোনের বড়ো গ্রুপদের বৈদ্যুতিক কাজ কর্মের নমুনায় যে পরিবর্তন অথবা মগজের তরঙ্গের যে পরিবর্তনগুলো সেগুলোই থাকে এই নিদ্রাচক্রগুলোতে।
একটি কাহিনী শুনাই। যখন একজন জার্মান মনোবিজ্ঞানী হ্যানস্ বার্গার ১৯২৪ সালে মগজে আড়িপাততে চাইলেন, তখন এক আশ্চার্য কাজ করলেন। ১৫ বছর বয়সী নিজের ছেলের করোটিতে, রূপার ফয়েলের দুটো ছোটোখণ্ড সাপটে দিলেন, সংযোগ দিলেন তারের, আর এই তারগুলো যুক্ত করলেন গ্যালভানোমিটারের সঙ্গে। গ্যালভানোমিটার এমন এক যন্ত্র যা তড়িত্ প্রবাহ পরিমাপ করে। তত্ক্ষণাত্ তিনি দেখতে পেলেন কিছু অদ্ভুত বিদ্যুত্ তরঙ্গ-আর তার ছেলের মগজ থেকে আসা এসব আজব বিদ্যুত্ তরঙ্গ লেখা এঁকে দিল কাগজের রোলে। সংকেতগুলো অনুসরণ করল নিয়মিত নমুনা বা ধরন। তিনি এর নাম দিলেন আলফা রিদম। বার্গারের এই সহজ মেশিন থেকে পরে উদ্ভাবিত হলো আজকনিকার ইলেকট্রোএনসেফালোপ্রাফ। অন্যদের ওপরও পরীক্ষা করলেন, এদের মগজেও আলফাতরঙ্গ উত্পন্ন হলো, তবে এরা যখন অঙ্ক ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হলো, তখন পালটে গেল মগজের তরঙ্গের ছন্দ। আলফা তরঙ্গ দেখায়, যে মগজ এখন অলস, আলফা অবস্থা হলো শান্ত, নিস্তব্ধ ও শিথিল অবস্থা। ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রামে এই তরঙ্গগুলো ঘটে সেকেন্ডে ৭-১২ বার। এই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে চোখে নামবে ঘুম। এরপর হালকা ঘুম। এবার প্রবেশ ধীরতর পর্যায়ে, থিটাতরঙ্গ, প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩-৭ চক্র, হ্রস্ব তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। এই ধীর তরঙ্গগুলোর মাঝে পুনঃপুনঃ দীপ্ত হয় উজ্জ্বল তরঙ্গ, একে বলে স্লিপস্পিনভলস্ প্রতি সেকেন্ডে ১২-১৫ সাইকেলস। নিয়মিত, উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ডেলটা তরঙ্গ এরপর আসে, প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১-২ সাইকেলস। মাত্র কয়েকটি স্লিপ স্লিনডস এর মধ্যে এরপর ঘুম গভীর হয়ে আসে, মগজ তৈরি করে এমন সব তরঙ্গ, যা সাধারণত: শঙ্কা লোপ হলে হয়, প্রতি সেকেন্ডে ১-৩ সাইকেলস্। এবার প্রবেশ ঘটে অত্যন্ত সক্রিয় পর্যায়ে, দ্রুত নিচু তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ, এই সময় আমাদের চোখের মনি ঘোরে বন্ধ চোখের পাতার নিচে যেন আমরা কোন কিছু নজর করছি- এই পর্যায়টি হলো রেপিড আই মুভমেন্ট, রেম বা রেম ঘুম। আঁখির দ্রুত সঞ্চালন। এই ঘুম থেকে উঠলে সবাই বলেন, যে স্বপ্ন দেখছিলাম। এটা বড়ো মজার কথা যে, এ সময় মগজ এত সক্রিয় হয় যা জাগরণের অনুরূপ। হূদ্ঘাত হার, শ্বাসকর্মের হার, রক্তচাপ সব বেড়ে যায় এবং পুরো শরীরটাই হয় অবশ। সারারাত ধরে রেম ঘুম প্রতি ৯০ মিনিটে পুনঃ পুনঃ ফিরে আসে নিয়মিত, চক্রাকারে, স্থায়ী হয় ১০ মিনিট থেকে আধঘণ্টা। শিশুরা ঘুমের অর্ধেকটা কাটায় রেম ঘুমে, তবে আমাদের বয়স যত বাড়ে রেম ঘুমের স্থায়িত্বকাল তত কমে। পূর্ণবয়স্ক লোকদের প্রতিরাতে রেম ঘুম হয় এক থেকে দু’ঘণ্টা। কেন আমরা স্বপ্ন দেখি—কেনই বা ঘুমাই: মোটেই স্পষ্ট নয় ব্যাপারটা। কিছু কিছু বিজ্ঞানী বলেন, রেম ঘুমের সময় মগজ সুযোগ পায় দিনের সব ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে বা সংরক্ষণ করতে, প্রোগ্রামগুলো আপডেট করতে, আর অনাবশ্যক তথ্য বাদ দিতে। এই পর্যায়ে সম্ভবত নিউরোনদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু সংযোগ মজবুত হয় আরো, অন্যগুলো আবার দুর্বল হয় বা হারিয়ে যায়। ঘুমন্ত মগজের বৈদ্যুতিক পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু নিউরোট্রান্সমিটারদের কাজকর্মের পরিবর্তনও ঘটে। যেমন যে নিউরোন নিঃসারণ করে নরইপিনেফ্রিন, এগুলো ধার তরঙ্গ ঘুমের আগাম পর্যায়ে বেশিবার প্রজ্বলিত হয় না, আর রেম ঘুমের সময় নিউরোনগুলো ছোড়ে না একেবারেই। জাগ্রত অবস্থায়, বিশেষ করে আবেগের উত্থানের সময়। এগুলোর কাজকর্ম খুব বেড়ে যায়।
এই নিউরোইপিনেফ্যিন যেসব নিউরোনের রয়েছে, সেগুলো মগজের কোষসমূহের এক শতাংশ মাত্র, আর এদের কোষদেহগুলো মস্তিষ্কমূলেই ঘন সন্নিবিষ্ট। আর মগজের নানা অংশের সঙ্গে এদের সংযোগ ব্যাপক ভাবে থাকার কারণে সুদূরপ্রসারী ফল তো পাওয়া যায়। নরইপিনেফ্রিন এবং সম্পর্কিক আর একটি নিউরোট্রান্সমিটার ‘সেরোটনিন’ মান খুব কম হলে মানুষ বিষণ্ন হয়ে যায়। ১৯৫০ সালে রক্তচাপ কমাবার জন্য ‘রিসার্পিন’ নামে যে ওষুধ ব্যবহূত হতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু লোক বেশ বিষণ্ন হয়ে পড়ত, অনেকের আত্মহত্যার প্রবণতা হতো। পরে দেখা গেল, এ ওষুধটি মগজের নবইপিনেফ্রিন ও সেরোটনিন মান হ্রাস করত বলে এমন ঘটত অনেকের। ডোপামিন নামে একটি নিউরোট্রান্সমিটারও আমাদের আবেগ ও মনের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য বড় প্রয়োজনীয়। এসব নিয়ে পরে লিখব।
nঅধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা
