নৌকা মানেই সমৃদ্ধি, ধানের শীষ মানেই জঙ্গিবাদ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৩০

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি-নিরাপত্তা এবং দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নৌকা মার্কা মানেই উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, স্বাধীনতা, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও কল্যাণ হওয়া- যা চিরজীবন দেশবাসীর প্রাপ্য। টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার শুভফল দেশের মানুষ এখন ভোগ করছে। আর ধানের শীষ মানেই দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, এতিমের অর্থ আত্মসাত্, লুটপাট, ককটেল, বোমা হামলা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সৃষ্টি। মানুষকে যারা মানুষ বলে গণ্য করে না, তারা কিভাবে আবার ধানের শীষে ভোট চায়? গতকাল শুক্রবার রাজধানী গুলশানের ইয়ুথ ক্লাব মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, এসব বিবেচনা করে নৌকা মার্কায় ভোট দিন। আমরা আপনাদের উন্নত জীবন দেব। মানুষের কোনো হাহাকার থাকবে না। যুবসমাজ চাকরি পাবে। একজন যুবক যাতে ১০-১৫ জন মানুষকে চাকরি দিতে পারে সেই ব্যবস্থা আমরা করবো।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীতে এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জনসভা। ব্যাপক জনসমাগমে জনসভাটি রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিকাল সাড়ে ৩টায় জনসভার সময় নির্ধারণ ছিল। কিন্তু সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ জনসভাস্থলে আসতে থাকেন। বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সভাস্থলে পৌঁছান। এ সময় লাখো জনতা দাঁড়িয়ে তুমুল করতালি ও বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।

দলীয় ইশতেহারে বাংলাদেশকে আরো সমৃদ্ধি এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ঘোষণা দিয়েছি, আমরা দুর্নীতি দূর করব। মানুষের কল্যাণে কাজ করব। মানুষের উন্নয়ন করব। দেশের শান্তি নিরাপত্তার জন্য, দুর্নীতি দমন করবার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চাই।’ আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও পরে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ। সেই উদযাপন সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই সুবর্ণজয়ন্তী আমরা তখনই পালন করতে পারব, যখন নৌকা মার্কায় ভোট পেয়ে আমরা সরকার গঠন করে জনগণের সেবা করতে পারব।’ দারিদ্র্য বিমোচন করে ‘উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা’ গড়তে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে সেবা করার সুযোগ দিতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নৌকার পালে হাওয়া লেগেছে, আজ নৌকার পক্ষে যে জোয়ার উঠেছে, ইনশাল্লাহ জয় আমাদের হবে। সরকার গঠন করে এ দেশের মানুষের সেবা করব, মানুষকে উন্নত জীবন দেব, আজ এ ওয়াদা রেখে যাচ্ছি।’

এ সময় ঢাকার বিভিন্ন আসনে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচনে তাদের জন্য ভোট চান। শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত লাখো জনতাও হাত তুলে নৌকায় ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, দেশের মানুষের উন্নয়ন করাই আমার মূল লক্ষ্য। এবার নৌকায় ভোট দিলে দেশের অর্থনীতি আরো উন্নত হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে উন্নয়নের রোল মডেল। অথচ একসময় বাংলাদেশকে খরা, দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ, অভাবের দেশ বলা হতো। যারা বিদেশে যেতেন, তাদের এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। তবে সেই বদনাম এখন আর নেই। এখন আর কারও কাছে হাত পেতে আমাদের চলতে হয় না। বাংলাদেশ আজ ভিক্ষুকের দেশ না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে।’ তিনি বলেন, আগামীতে দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবো, যেন বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে সমীহ করে। সারাদেশে আমরা যে ১০০টি শিল্পাঞ্চল করছি, তাতে সোয়া কোটি যুবকের কর্মসংস্থান হবে। আওয়ামী লীগকে ভোট না দিলে এ প্রকল্প থেমে যাবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সব প্রকল্প বন্ধ করে দেবে।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বস্তিবাসীসহ নিম্ন আয়ের মানুষরাও যেন ফ্ল্যাটে থাকতে পারেন সেই ব্যবস্থা করে দেওয়ার অঙ্গীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকায় বস্তির মধ্যে অনেক মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে। আমরা এমন ব্যবস্থা নিচ্ছি যাতে আর তারা এভাবে না থাকেন। ফ্ল্যাটে থাকবে তারা। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক হারে যে যেভাবে চাইবেন এসব ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।’ তিনি আরো বলেন, ঢাকার নাগরিক সুবিধা বাড়াতে মেট্রোরেল হচ্ছে। অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস হবে। পাতাল ট্রেন করে দেব। শেখ হাসিনা বলেন, গুলশান-বনানী থেকে শুরু করে সমগ্র ঢাকার উত্তরণ, বিশেষ করে যেসব ইউনিয়ন ছিল সেগুলোকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছি। মানুষ যাতে নাগরিক সুবিধা পায়

সেজন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। জঙ্গিবাদ দমন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই গুলশানে যখন হলি আর্টিজানে হামলা হলো, সবাই ধারণা করেছিল এর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কিন্তু মাত্র ৮/৯ ঘণ্টায় আমরা কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছি এবং উদ্ধার করেছি। এরপর থেকে আমরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের স্থান বাংলাদেশে নেই। মাদক নির্মূলে অভিযানও শুরু করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতার শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংস কায়দায় হত্যার মাধ্যমে জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল তারা। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারে এসে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়। পিছিয়ে দেওয়া হয় দেশকে। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে দেশের উন্নয়নে মনোযোগ দেয়। এখন কারও কাছে আমাদের হাত পেতে চলতে হয় না। বাজেট বাড়িয়েছি ৭ দশমিক ৬ ভাগ। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে এসে দেখি এ ঢাকা শহরেই পানির অভাব, বিদ্যুত্ নেই, লোডশেডিং, রাস্তাঘাট নেই, যা আছে ভাঙাচোরা। সবসময় লোডশেডিং হতো। ছিনতাই-জঙ্গিবাদতো ছিলই। সব কিছু কাটিয়ে উঠেছি আমরা। আগে ৮/১০ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হতো। আল্লাহর রহমতে এখন আর লোডশেডিং নেই। ২০০৮ সালে যেখানে আমাদের বিদ্যুত্ ছিল ৩২০০ মেগাওয়াট, এখন আমরা ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছি। প্রত্যেকটি এলাকায় হাসপাতাল করে দিয়েছি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আমরা পানির সমস্যার সমাধান করে দিয়েছি, এখন আর পানির সমস্যা নেই। তবে আমি অনুরোধ করব, পানির যেন অপচয় না হয়।

ডিজিটালাইজেশনে সরকারের নানা কর্মকাণ্ড তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। প্রত্যেকের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। বিএনপির একজন মন্ত্রী ছিলেন, মোবাইল ব্যবসা করতেন। তখন একটা মোবাইল ফোন কিনতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা লাগত। কল করলেও ১০ টাকা, ধরলেও ১০ টাকা। এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন, আমরা এই সুযোগ করে দিয়েছি। শিক্ষার হার বাড়াতে স্কুল-কলেজ করে দিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানের মানও উন্নত করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এতিমের অর্থ আত্মসাত্ করি না। এতিমের অর্থ আত্মসাত্ করেছিলেন (বিএনপি প্রধান) খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল তারই পছন্দের ইয়াজউদ্দিন আহমেদ-ফখরুদ্দিন আহমেদ-মইন ইউ আহমেদরা। সেই মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে। এতিমের টাকা চুরি করলে তো শাস্তি ভোগ করতেই হবে, এটা কোরানেরও বিধান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নামে এতিমের অর্থ আত্মসাতের মামলা দিয়েছিল কেয়ারটেকার সরকার। কারা ছিল সেই সরকারে? সবাই ছিল খালেদা জিয়ার পছন্দের ব্যক্তিত্ব। মামলা তারাই দিয়েছিল।’ খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো (প্রয়াত) অর্থপাচার করে ধরা পড়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, তার এক ছেলের অর্থ আমরা দেশে ফেরত এনেছি। যত অপকর্ম করা যায়, তা-ই তারা করেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, তারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অর্থ পাচার করেছে। খালেদা জিয়ার দুই ছেলে অর্থ পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে বিলাসবহুল জীবনের কী অর্থ থাকতে পারে?

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাসের কথা দেশবাসী এখনো ভুলে যায়নি। কেউ কখনো কোনো মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে? তারা জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, মসজিদ পুড়িয়েছে, কোরান শরীফে আগুন দিয়েছে। বাসের ভিতর হেল্পার পুড়ে অঙ্গার হয়ে আছে, এমন দৃশ্য আপনারা দেখেছেন। তাদের আগুন সন্ত্রাসের হাত থেকে অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এমনকি ছোট্ট শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। এদের ভিতরে যদি বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব থাকত জীবন্ত মানুষকে ককটেল মেরে আগুন দিয়ে পোড়াতে পারত না।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম আতিক, চিত্রনায়ক ফারুক, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ও ঢাকা-১ আসনের নৌকার প্রার্থী সালমান এফ রহমান, ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী আসলামুল হক, ঢাকা-১৫ আসনের কামাল আহমেদ মজুমদার, ঢাকা-১৬ আসনের মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।