জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনী হামলা, সহিংসতা, নৈরাজ্য তত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালত একে একে প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করে চলেছেন। এতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচনের পূর্বেই নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে যেতে হচ্ছে। এর সুবিধা নিচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। এর মধ্য দিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনের বাইরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর পুরানা পল্টনের জামান টাওয়ারে ঐক্যফ্রন্টের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুসারে ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে ঢাকা-৪ থেকে ১৮ আসনে একইসময়ে জনসভা ও গণমিছিল করা হবে। এছাড়া আগামী ২৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, অনুমতি নেওয়ার বিষয় আমার না। আমরা তাদের অবগত করব, এছাড়া জনসভা করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। তাদের মন চাইলে তারা বন্ধ করে দিক। এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, এ ধরনের জনসভায় সাধারণত আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। কমিশনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জনসভা কেন? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের উত্তরে আলাল বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এমন বলে থাকে তাহলে তারা সঠিক এবং আইন অনুযায়ী কথা বলেননি।
সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল বলেন, পুলিশকে সংঘবদ্ধভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা প্রায় ৫০ বছরের। পুলিশ আদেশপ্রাপ্ত হয়ে সারা দেশে যেভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে তা নজিরবিহীন। পরিকল্পিতভাবে পুলিশকে এভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া কোনোদিন আমি দেখিনি। ভোটের আরও সাতদিন আছে, আমি গঠনমূলকভাবে বলতে চাই এটা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কারণ এটা স্পষ্টত সংবিধানের লংঘন। সংবিধানের লংঘন করা গুরুতর অপরাধ এবং স্বাধীনতার ওপরে আঘাত করার শামিল। এর চেয়ে বড় কোনো অপরাধ হতে পারে না। পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে অত্যাচারের পথ পরিহার করে সঠিকপথে ফিরে আসার এবং নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) এ ব্যাপারে সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে ড. কামাল বলেন, আপনাদের দুঃশাসন সব স্বৈরাচারকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থহীন বিজয় হওয়ার চেয়ে নির্বাচন হতে দিন। এটাকে প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত করবেন না। নির্বাচনে জিততে হবে কিন্তু এই ভাবে না। এসব হামলা নজিরবিহীন। কালকে থেকে আমরা রিপোর্ট নেব আপনারা ঠিকমতো কাজ করছেন কি-না।
তিনি বলেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে ভোটের সুযোগ দিতে হবে। না হলে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। তখন মহাসংকট তৈরি হবে। স্বাধীন দেশে জনগণ হলো ক্ষমতার মালিক। সেই জনগণ যদি তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে সেটি হবে স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে কামাল হোসেন বলেন, উচ্চ আদলতের নির্দেশে এ পর্যন্ত ১৩টি নির্বাচনী এলাকায় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। ১৬ জন প্রার্থী আছেন কারাগারে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের পদত্যাগ করে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিধান ‘সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে দাবি করেন প্রবীণ এই আইনজীবী।
ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা আরও বলেন, এ দেশে মানুষ বহু রক্ত দিয়ে অবাধ নির্বাচনের অধিকার আদায় করেছে। অনেক জীবনের মূল্যে তারা এই অধিকার লাভ করেছে। আজ ৪৭ বছর পর তারা এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে তা আমরা ভাবতে পারি না। এরকম একটা সংবাদ সম্মেলনে এই কথাগুলো আমাদের বলতে হবে তা আমার জন্য দুঃখজনক। এই নির্বাচন তো ৫ বছর আগে করার কথা ছিল। পাঁচ বছর তো কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করবেন না। যদি ন্যূনতম গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা করেন তা হলে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন।
সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কামাল হোসেন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বলা হোক আপনারা কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করবেন না। আমি পুলিশের আচরণ দেখে অবাক হয়েছি। আমি যে দুঃখ পেয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। ডিকশনারি খুলে দেখুন নিরপেক্ষ মানে কি। আর আপনারা যেটি করছেন তা সেটির উল্টো কি না। এখন ১৬ আনা পরিপন্থি কাজ করছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ১৬জন প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভুতুড়ে মামলায় আরও ২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতার পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আফরোজা আব্বাস, রুমানা মাহমুদ টুকু, সাবিনা ইয়াসমিন ছবি, কনক চাঁপাসহ ৫ নারীর ওপর হামলা করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের বাধা দিচ্ছে পুলিশ। নেতা-কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু প্রমুখ।
