মানিকগঞ্জে মধু আহরণে ব্যস্ত মৌচাষিরা

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:২২

সরিষা ফুলের সমারোহে মানিকগঞ্জের গ্রামগুলো এখন হলদে রঙ ধারণ করেছে। এবারে মানিকগঞ্জে প্রচুর সরিষার আবাদ হয়েছে। লাভজনক বলে অনেকেই সরিষা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। সরিষা চাষে জমির উর্বরতাও বৃদ্ধি পায়। সরিষা আবাদ শেষে ওই জমিতে বোরো চাষও করা যায়। ক্ষেতের পর ক্ষেত হলদে সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে। আর হলদে ফুলের টানে ছুটে আসছে মৌমাছির দল। জেলার বিভিন্ন গ্রামে সরিষা ক্ষেত থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করছেন মৌ চাষিরা। বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার মৌচাষি বিপুল সংখ্যক কাঠের বাক্স নিয়ে এসে হাজির হয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে তারা মধু আহরণ করবেন। ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চলবে মধু আহরণ। এবার মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩ মেট্রিক টন। তাই সরষে চাষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মৌসুমি মৌচাষিদের তত্পরতা। তারা অস্থায়ী বসতি গড়েছেন এ জেলায়। সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের প্রধান মৌসুম  যে এখনই।

সিংগাইর বায়রা এলাকার কৃষক তমেজ মিয়া জানান, বছরে ৩ একর জমিতে সরিষা চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছি। প্রতি মৌসুমে ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত লাভ করেছি। চলতি মৌসুমে সরিষার ভালো ফলন আশা করছি। সাতক্ষীরা, গাজীপুর, পাবনা, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ থেকে আসা শতাধিক মৌচাষি মানিকগঞ্জের বিভিন্ন প্রান্তে সরিষা ফুল থেকে বিশেষ কায়দায় মধু সংগ্রহ করছেন। সংগৃহীত এই মধু রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্রি হয়। বছরের নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ চলে। এ সময় গড়ে একেক জন মৌচাষি প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ মণ মধু আহরণ করতে পারেন। সেই হিসেবে সরিষার এই মৌসুমে একেকজন মৌচাষি বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মণ মধু সংগ্রহ করতে পারেন। যার পাইকারি বাজার মূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা।

বাগের হাটের মৌচাষি ফয়সাল জানান, গড়পাড়া ইউনিয়নের উকিয়ারা এলাকায় ৭ বছর ধরে নিয়মিতভাবে সরিষা ক্ষেত থেকে মৌমাছির মাধ্যমে তিনি মধু সংগ্রহ করছেন। এ বছর তিনি ১৫০টি বাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছেন।  প্রতিটি বাক্স থেকে তিনি ৩ কেজি পরিমাণ মধু সংগ্রহ করছেন। সাতক্ষীরা থেকে আসা আরো কয়েকজন মৌচাষি জানান, মধু সংগ্রহে তারা ‘সুপার চেম্বার, বুরট, নিউক্লিয়াস’ নামের বাক্স ব্যবহার করে থাকেন। সরিষা ক্ষেতে বাক্সগুলো রাখার কিছু সময় পর থেকেই মৌমাছিরা সরিষা ফুল থেকে আহরিত মধু এনে বাক্সে জমা করে। সপ্তাহে একবার বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা যায়। এই মধু ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন তিনি।

ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশেই সরষে ক্ষেতে মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম নিয়ে বসে ছিলেন জামালপুরের ছাইফুল ও রফিকুল। তারা জানান, তাদের বাক্সের সংখ্যা একশ’র কাছাকাছি। তারা প্রতিমণ মধু ৯/১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও উত্তরাতে। গাজীপুর থেকে আসা আরেক মৌচাষি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে তিনি ও তার দল তিনশ মৌবাক্স নিয়ে এখানে এসেছেন। সরিষা ফুল শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকবেন তারা। এখান থেকে তারা ৪০ মণ মধু সংগ্রহ করবেন। মৌচাষিরা জানান, উন্নত প্রশিক্ষণ আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরো বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারতেন তারা। এতে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে মধু রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, মানিকগঞ্জ জেলায় এবার ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সরিষা ক্ষেতে এবার সাড়ে ৪ হাজার মৌ বাক্স বসছে। এখান থেকে ৮৩  মেট্রিক টন মধু সংগ্রহ যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এতে প্রতি কেজি মধু ৪ শ টাকা কেজি পাইকারি দরে বিক্রি হবে। সে হিসেবে সোয়া তিন কোটি টাকার মধু বিক্রি হবে। তবে মধু উত্পাদনের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে কারণ গতবারের চেয়ে এবারে সরিষা আবাদ বেশি হয়েছে।