প্রতিযোগিতাটা জামাইদের

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৬

মাছের মেলা মাছে ভরপুর থাকাটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে ছোটখাটো মাছ নয়, কত বড় মাছ বাজারে তোলা যায় সেটারও একটা প্রতিযোগী দেখা যায় জেলেদের মধ্যে। এসব মাছ শুধুই মাছ কেনার বিষয় নয়, এখানেই শুরু প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা শুধু এলাকার জামাইদের। কোন জামাই কত বড় মাছ কিনলেন, সেটাই আসল বিষয়। প্রতিযোগিতায় নীরব অংশগ্রহণ আছে শ্বশুরদেরও। কার মেয়ের জামাই কত কেজির মাছ কিনলো সেটা সবাইকে জানাতে হবে ঘটা করে! বড় ব্যতিক্রমী এই মেলার আয়োজনস্থল গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রাম।

ঐতিহ্যের এই মেলা মূলত ‘জামাই মেলা’, যা পৌষের শেষে অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় চলে জামাইদের মাছ কেনার প্রতিযোগিতা। এই দিনটিকে ঘিরেই এখানে ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত (দিনব্যাপী) চলে নানারকম আনন্দ-উত্সব। দিনটির জন্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকেন উপজেলাবাসী। বিনিরাইল এবং এর আশেপাশে গ্রামে যারা বিয়ে করেছেন, সে সমস্ত জামাইরা হচ্ছেন ওই মেলার মূল ক্রেতা ও দর্শনার্থী।

একটা মাছকে ঘিরে ক্রেতা জামাইদের জটলা লেগে আছে। মাছের নাম বাঘাড়। বিক্রেতা দাম হেঁকেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ক্রেতাদের মধ্যে স্থানীয় ভাটিরা এলাকার জামাই আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া মাছটির দাম সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা বলছেন। কিন্তু বিক্রেতা আরো বেশি দাম পাওয়ার আশায় মাছটি ছাড়ছেন না। চলছে দর কষাকষি। যত না ক্রেতা তার চেয়ে অনেক বেশি উত্সুক জনতা ভিড় জমিয়েছেন মাছটি দেখার জন্য।

উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন তো এসেছেনই, এর বাইরে থেকে অনেকে এসেছেন উপজেলার সর্ববৃহত্ এই মাছের মেলায়। গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে অনেক মানুষ শুধু এই মেলার জন্যই কালীগঞ্জে এসেছেন। প্রতিবছর পৌষসংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা। এবারের মেলায় ৮ শতাধিক ব্যবসায়ী বাহারি মাছ সাজিয়ে বসেন বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে। সামুদ্রিক চিতল, বাগাড়, আইড়, বোয়াল, কালবাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাইকলা, রূপচাঁদার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে নানারকম দেশি মাছও।

মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম নুরু মাঝি জানান, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। এ মেলা গাজীপুর জেলার সবচেয়ে বড় মাছের মেলা হিসেবে স্বীকৃত। এই মেলাটি প্রথম অনুষ্ঠিত হতো খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষসংক্রান্তি ও নবান্ন উত্সবে। প্রায় আড়াশ’ বছর যাবত্ মেলাটি আয়োজিত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ মেলাটি একটি সার্বজনীন উত্সবে রূপ নিয়েছে। তিনি আরো জানান, শুরুতে এ মেলা শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও বর্তমানে এটা সব ধর্মের মানুষের কাছে ঐতিহ্যর উত্সবে পরিণত হয়েছে।

এলাকার জামাইরা বলেন, ‘শ্বশুরবাড়িতে মাছ নিয়ে যাওয়া বলে কথা। তাই এলাকার সব জামাইদের নজর বিনিরাইলের মাছের মেলার বড় মাছটির দিকেই। তাই স্থানীয় বড় বড় মাছ ব্যবসায়ীরা সপ্তাহখানেক ধরে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে থাকেন। সেই অনুযায়ী মাছের দামও হাঁকানো হয়।