শিফারুল শেখ
ব্রিটেনের রাজবধূ ডায়ানার নাম শোনেননি এমন শিক্ষিত লোক পাওয়া ভার। সেই ফ্যাশন তারকার ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি। রাজপরিবার এবং রাজকীয় উপাধি দুটোই ছেড়েছেন প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী প্রিন্সেস মেগান। এমনকি রাজপরিবারের ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থও নেবেন না তারা, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর জীবন কাটাবেন। তাদের আকস্মিক ঘোষণায় রাজপরিবারসহ পুরো বিশ্ব বিস্মিত। রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এর কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমত, প্রিন্স হ্যারি রাজা হবেন না ও প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং দ্বিতীয়ত, মেগানের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ ও স্বাধীন জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
রাজপরিবারের বাইরে তারা কতদিন থাকতে পারবেন, সেটাই বড়ো প্রশ্ন। অনেকেই মনে করছেন, একবিংশ শতাব্দীর ব্রিটেনে রাজপরিবারের কতখানি ভূমিকা থাকা উচিত প্রিন্স হ্যারি ও মেগানের এভাবে সরে যাওয়া সেই প্রশ্নটিকে নতুন করে জীবন দেবে।
g রাজা হবেন না প্রিন্স হ্যারি!
প্রিন্সেস ডায়ানার সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর কেইন হোয়াফির দাবি, বড়ো ভাই উইলিয়ামকে মাঝে মাঝেই বিরক্ত করতেন ছোট্ট হ্যারি। বালক বয়সে একদিন গাড়িতে মা ডায়ানা ও ন্যানিদের সঙ্গে যাচ্ছিলেন দুই ভাই। হঠাত্ হ্যারি বলে উঠলেন, ‘ঠিক আছে! আমি সবকিছু করতে পারি, কারণ আমি রাজা হবো না। তুমি সেখানে থাকবে, তাই আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি’। আর প্রিন্স উইলিয়ামও কিন্তু এই ভেবে খুশি যে, অন্তত আমার ভাই জানে যে আমি রাজা হবো। অথচ ডায়ানা বলতেন, হ্যারি খুব ভালো রাজা হবে। এজন্য তাকে তিনি ‘গুড কিং হ্যারি’ নামে ডাকতেন।
রাজপরিবারের জীবনী লেখক অ্যান্ড্রিউ মর্টোন তার ‘উইলিয়াম এবং ক্যাথরিন’ নামের বইয়ে লিখেছেন, উইলিয়াম যখন বলতেন তিনি পুলিশ হবেন এবং তার মাকে দেখবেন, তখন হ্যারি বলতেন, না তুমি সেটা হবে না, কারণ তুমি রাজা হবে। আবার শৈশব থেকেই উইলিয়াম তত্কালীন রানির সঙ্গে দেখা করতে যেতেন হ্যারিকে ছাড়াই। ডায়ানাও হ্যারিকে একা রেখে যাওয়ার বিষয়টি জানতেন। দুই ভাইয়ের বন্ধুদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য সান জানিয়েছে, তাদের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠছে নানা ইস্যুতে। বিশেষ করে মেগান মার্কেলকে নিয়ে। বিবিসির সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড জানান, রাজপরিবারের অন্যদের সঙ্গে হ্যারি-মেগানের যে বড়ো ধরনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে এ তারই প্রমাণ।
বর্তমানে রাজসিংহাসনে বসার তালিকাটা এমন : রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেলে প্রিন্স চার্লস রাজা হবেন। এরপর আছেন—প্রিন্স উইলিয়াম, তার সন্তান প্রিন্স জর্জ, প্রিন্সেস শার্লট, প্রিন্স লুইস, ভাই প্রিন্স হ্যারি ও তার ছেলে আর্চি মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর ও চার্লসের ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রিউ। হ্যারির পরিবর্তে অ্যান্ড্রিউ তার স্থান দখল করবেন। অর্থাত্ উইলিয়ামের তিন বছরের ছোটো হ্যারির রাজা হওয়ার সম্ভাবনা কম!
g মেগানের অস্বস্তি
ব্রিটিশ মিডিয়ায় ২০১৮ সালের মে পর্যন্ত ভালোই ছিলেন অভিনেত্রী মেগান মার্কেল। হ্যারির সঙ্গে তার প্রেমের খবর প্রকাশ হওয়ার পরও বলা হতো, তার মতো রাজবধূ এখনো হয়নি। কিন্তু বিয়ের শুরু থেকেই সেই প্রশংসা যেন কুত্সায় পরিণত হয়। তার জন্ম, মা-বাবা এবং রাজপরিবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সমস্যাগুলো ক্রমেই মিডিয়ায় আসা শুরু করে। মেগানও স্বীকার করেন, প্রিন্স হ্যারিকে বিয়ে করলে যে রাজপরিবারের নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়তে হবে তা তিনি বুঝতে পারেননি। অভিনেত্রী হওয়ায় স্বাধীন জীবনের আকাঙ্ক্ষাই তাড়া করতো দ্বিতীয় বার বিয়ে করা ও স্বামীর চেয়ে বেশি বয়সের মেগানকে। আর প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী কেট মিডলটন ফর্সা, মেগান একটু কালো।
রাজকীয় জীবন হলো রাজপ্রাসাদ আর খ্যাতি। কিন্তু তারকাদের চেয়ে বড়ো পার্থক্য হলো এর একটা দায়িত্ব আছে। ম্যাগাজিনগুলো অনেক সময় রাজপরিবারের এক সদস্যকে অন্য সদস্যের সঙ্গে তুলনা করে লেখে যাতে সংঘাত তৈরি হয়। হ্যারি-মেগান যেভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেন তাকে তুলনা করা যায় তার মা প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে। ডায়ানার রাজকীয় জীবনও সুখের ছিল না। হয়তো সে কারণেই রাজপরিবারের বাইরে সুখের সন্ধান করতে চাইছেন। তারা উত্তর আমেরিকা ও ব্রিটেনে সময় ভাগ করে কাটাবেন। ব্রিটেনে এসে তারা রানির দেওয়া বাসভবন ফ্রগমোর কটেজে থাকবেন। এই কটেজ সংস্কারে প্রায় ২৫ লাখ পাউন্ড খরচ হয়েছে। জনগণের করের এই অর্থ হ্যারি-মেগান ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছেন।
g অর্থ কোথা থেকে আসবে
হ্যারি ও মেগান রাজপরিবার থেকে ভাতা না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর অর্থ এই নয় যে, তারা কিছুই পাবেন না। রানির কাছ থেকে তারা তাদের আয়ের মাত্র ৫ ভাগ পান। বাকি অর্থ আসে ডাচি বা বাবা প্রিন্স চার্লসের কাছ থেকে। এমনকি হ্যারি যদি সেই অর্থও নেওয়া বন্ধ করে দেন তাতেও সমস্যা নেই। কারণ বিয়ের আগেই মেগানের কাছে ৩৮ লাখ পাইন্ড থাকার কথা জানা যায়। আবার প্রিন্স হ্যারি তার প্রমাতামহ ও মায়ের কাছ থেকে অন্তত ৩ কোটি পাউন্ড পেয়েছেন। প্রিন্স অব ওয়েলসও তার সম্পদের তিন শতাংশ ছেলেদের মধ্যে এবং বাকিটা ১৭ ধর্মসন্তানকে দিয়েছেন।
হ্যারি ও মেগান এরই মধ্যেই কয়েকটি চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন। তারা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানও চালাবেন যা আমেরিকা ও আফ্রিকায় কাজ করবে। আইন অনুযায়ী, লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। একজন আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ অতিথি যেভাবে নিরাপত্তা পান তারাও সেভাবে নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন। তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী টুডো বলেছেন, তাদের নিরাপত্তার অর্থ ব্যয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এবারই প্রথম নয়, এর আগেও প্রেম-বিয়ে নিয়ে একাধিকবার বিব্রত হয়েছে রাজপরিবার। যেমন- চার্লস-ক্যামিলা, ডায়ানা-দোদি, রাজকুমারী অ্যান, রানির বোন মার্গারেট-পিটার টাউনসেন্ড, অষ্টম এডোয়ার্ড-ওয়ালিস সিম্পসন, চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রিউর সম্পর্ক।
