বার্নার্ড শ অনেক আগেই বলেছেন, একটি কেন্দ্রে ভোটদাতার সংখ্যা যদি হয় দশ জন, আর সেখানে যদি প্রার্থী থাকে চারজন, তাদের মধ্যে কেউ পেল একটি ভোট, কেউ পেল দুটি, কেউ পেল তিনটি আর যে চারটি পেল সে নির্বাচিত হয়ে গেল, যদিও ছয়জন মানুষই তাকে চায়নি। ইংল্যান্ডের রাজনীতির কথা ভেবে বার্নার্ড শ এ কথা বললেও এখনও সে অবস্থা খুব একটা পাল্টায়নি। তবুও জনপ্রতিনিধি খুঁজে নেওয়ার এরচেয়ে ভালো সমাধান এখনও খুঁজে পায়নি বিশ্ব সভ্যতা। যদিও দু’একটি দেশ প্রেসিডেন্ট বা সরকার প্রধানের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার বিধান রেখেছে। কিন্তু সব দেশ এটা করবার সাহস দেখায়নি।
নির্বাচন হচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরের কোনো পদে প্রার্থীদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক প্রার্থীকে বাছাই প্রক্রিয়া। প্রকাশ্য বা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়ে নির্বাচন করা হয় জনপ্রতিনিধি। তাই সংসদ নির্বাচন হোক কিংবা পৌরসভা, অ্যালামনাই এসোসিয়েশন হোক, সাংবাদিক সমিতি হোক কিংবা ট্রাকচালক সমিতি, সবখানেই প্রতিনিধি খুঁজে নেওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে ভোট। কারণ দেখিয়ে বলা হয়, গণতন্ত্রের এই নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি রক্ষাকবচ আছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা সমিতি নেতারা যতদিন খুশি গদি আঁকড়ে থাকতে পারে না, পাঁচ বছর পর পর তাদের জনগণের কাছে আসতে হয়। তাই, আবারও নির্বাচনে জেতার জন্য তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। তা নাহলে, এলাকার জনগণ নতুন নেতৃত্ব খুঁজে নেবে।
দেশে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশ সরগরম। ভোটারের ভোট নিজের বাক্সে টানতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী সবাই আগামিতে নির্বাচিত হলে কি করবেন তা জানিয়ে ভোটারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন- ব্যালটে তার মার্কায় সীল মারার আর্জি নিয়ে।
আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে গঠিত রাজনৈতিক দলের উদ্ভবের ফলে ঐতিহ্যগত নির্বাচন পদ্ধতির রূপান্তর ঘটেছে। নির্বাচন এখন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ত্রয়োদশ শতকে ইংল্যান্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে আধুনিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। ১৮৭২ সালে গোপন ব্যালট পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়, ১৯২৮ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকারের বিধান চালু হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই গ্রিস ও রোমে নির্বাচনের ব্যবহার হয়ে আসছে এবং গোটা মধ্যযুগে রোমান সম্রাট ও পোপের মতো শাসক বাছাই করতেও নির্বাচনের ব্যবহার হতো। প্রাচীন ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজারা বাছাই করতেন রাজাদের। নির্বাচনের ইতিহাস অনেকটা জুড়েই রয়েছে ভোটাধিকারের প্রশ্ন, বিশেষ করে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভোটের অধিকার পাওয়ার বিষয়টি। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছিল পুরুষরাই, নির্বাচকমণ্ডলীতেও তাই এদেরই প্রাধান্য থাকত, অন্যান্য বহু দেশেও এই একই ধারা চলে আসছিল। যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতে শুরুর দিকের নির্বাচনগুলিতে জমিদার অথবা শাসক শ্রেণির পুরুষদের প্রাধান্য ছিল। ১৯২০ সাল পর্যন্ত অবশ্য পশ্চিম ইউরোপের সমস্ত দেশ এবং উত্তর আমেরিকার গণতন্ত্রে সর্বজনীনভাবেই পুরুষ ভোটাধিকার চালু ছিল এবং তারপর থেকে বহু দেশ মহিলাদের ভোটাধিকার দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল। পুরুষদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের কথা আইনগতভাবে সিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময়েই অবাধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থ বাধার সৃষ্টি করত।
নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকরা বলছেন, সকল আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কোনো এক ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ধরন ছিল প্রায় অভিন্ন। নির্বাচন ছিল প্রাচীন গ্রিসীয় শাসন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য এবং সেখানে সাধারণত লটারির মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন হতো। আমেরিকার আদিবাসীদের অনেক গোত্রের লোকেরা নির্দিষ্ট কোনো পাত্রে শস্যকণা নিক্ষেপের মাধ্যমে গোত্রপ্রধান নির্বাচন করত। প্রাচীন ভারতে কখনও কখনও স্থানীয় প্রধান নির্বাচিত হতেন। মোঘল শাসনবিধানে স্থানীয় জনগণের মনোনীত ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। সম্রাট জেলা পর্যায়ে ফৌজদার ও অপরাপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ করতেন এবং অন্য কর্মকর্তারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। বাংলায় গ্রামের লোকেরা নিজ নিজ গ্রামের মোকাদ্দম বা গ্রামপ্রধান, পাটোয়ারী বা কর আদায়কারী নির্বাচন করত। গ্রাম মোকাদ্দমদের পরামর্শক্রমে পরগণা কাজী ও থানাদার নিযুক্ত হতেন। ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত প্রচলিত গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনধর্মী বৈশিষ্ট্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। কিন্তু উনিশ শতকের সত্তর ও আশির দশকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পঞ্চায়েত প্রথা বহাল ছিল।
বাংলার নির্বাচনী ব্যবস্থা
শুরু থেকেই বাংলার জনগণ নির্বাচনে উত্সাহী ছিল। তবে, বাংলায় নির্বাচনী ব্যবস্থা একইভাবে বিকশিত হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসকেরা নির্বাচিত স্থানীয় সরকার যেমন গ্রামপ্রধান, পঞ্চায়েত, পাটোয়ারী, আমীন, মুনসেফ, থানাদার ও কাজীর পদসমূহ বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রাচীন নির্বাচন ব্যবস্থা তুলে দেয়। ১৮৬৮ সালে পৌর আইন করার মধ্য দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ মনোনীত সদস্য সমন্বয়ে পাশ্চাত্য ধরনের পৌর কমিটি গঠনের বিধান প্রবর্তন করা হয়। শুধুমাত্র পৌরকরদাতাদেরই সদস্য নির্বাচিত করার অধিকার ছিল। বাংলার পৌরসভাগুলোর মধ্যে প্রথমদিকে ১৮৬৮ সালে শ্রীরামপুর, বর্ধমান ও কৃষ্ণনগরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৮৪ সালে ঢাকাসহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভাসমূহ নির্বাচনী ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। সেইসঙ্গে আংশিক নির্বাচন ও আংশিক মনোনয়নের ভিত্তিতে জেলা কমিটি ও স্থানীয় বোর্ডসমূহ গঠিত হয়। পৌর ও গ্রাম এলাকায় এই সীমিত নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই গ্রাম পর্যায়ে ভোটাধিকার সমপ্রসারণের নতুন পর্বের সূচনা হয়। ১৯০৯ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় আইনসভায় নির্বাচনের বিধান চালু করা হয়। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ভোটাধিকার ও নির্বাচনী সংস্থাকে সমপ্রসারিত করা হয়। ১৯০৯ সাল থেকে সমপ্রদায় ও পেশার ভিত্তিতে নির্বাচন শুরু হয়। ১৯২০ সাল থেকে অনিয়মিতভাবে হলেও পৃথক নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয়, পৌরসভা ও জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন তখনও সর্বজনীন না হলেও সেখানে ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছিলেন দেশের মানুষ। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক আইন পরিষদে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তিতে এটাই ছিল সবশেষ নির্বাচন।
এর আগে, ঢাকা পিপল্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবির প্রেক্ষিতে ঢাকা পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের বিধান করা হয়। ভোটাধিকার সমপ্রসারণের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল জনগণের দাবির ফল। কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থায় জনগণের আগ্রহ সত্ত্বেও পাশ্চাত্য ধাঁচের নির্বাচন বাংলায় কখনও সাফল্যের সঙ্গে কার্যকর হয়নি। লক্ষণীয় যে, ভারতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ঔপনিবেশিক শাসকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঔপনিবেশিক, সামপ্রদায়িক বা গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। তাই ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় সরকার সর্বদাই নির্বাচনকে স্থানীয় অনুগত প্রভাবশালী মহল, বিশেষ করে জমিদারদের অনুকূলে প্রভাবিত করতে সচেষ্ট ছিল। ১৯৩৫ সাল অবধি পৌরসভা, স্থানীয় পর্যায়ের কমিটি ও বোর্ডে নির্বাচিত ও মনোনীত উভয় ক্ষেত্রেই জমিদারদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। এমনকি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনেও তাদের প্রভাব বজায় ছিল। ১৯২০ সাল পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন ছাড়াই প্রার্থীরা ব্যক্তিগত ও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। এমনকি ১৯৩৭ সালের নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।
রাজনৈতিক মেরুকরণ
ভারতবর্ষে শুরু হয় মেরুকরণের ইতিহাস। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিরঙ্কুশভাবে পরাজিত করে। প্রায় ৩০০ প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৮ জন (হিন্দু ৬ ও মুসলিম ২) নির্বাচিত হন। এভাবেই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনের যুগের অবসান ঘটে। পরবর্তীকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাফল্য ছিল একান্তই ব্যতিক্রম। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর হিন্দুদের ব্যাপকভাবে দেশত্যাগ, জমিদারি প্রথার বিলোপ এবং ১৯৫৬ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকারের বিধান প্রবর্তনের ফলে বিভাগপূর্ব নির্বাচন পদ্ধতি পুরোপুরি বদলে যায়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ ও জেলা বোর্ড নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে নবীন ও অনাবাসিক আইনজীবীরা প্রাধান্য বিস্তার করে। ষাট ও সত্তরের দশকে এ প্রক্রিয়ার খুব দ্রুত বদল ঘটে এবং তখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পেশাদার রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
আইয়ুবের দমনমূলক শাসন (১৯৫৮-১৯৬৯), স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন (১৯৬৬-১৯৭১), মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা নির্বাচনের ধারাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচন গণআন্দোলনের ফসল। বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দুটি স্বাভাবিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করতে খুব বড় ভূমিকা রাখে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
