পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী, শাশুড়ি ও দুই প্রতিবেশীকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন নির্মল কর্মকার (৩৮) নামের এক ব্যক্তি। এরপর ঘরের আড়ার সঙ্গে রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন। গতকাল রবিবার ভোররাতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পাল্লাথল চা-বাগানে এ ঘটনা ঘটেছে। হামলায় নিহতরা হচ্ছেন নির্মল কর্মকারের স্ত্রী জলি বুনার্জি (৩০), শাশুড়ি লক্ষ্মী বুনার্জি (৬০), প্রতিবেশী বসন্ত বক্তা (৬০) ও তার মেয়ে শিউলী বক্তা (১৪)। হামলায় বসন্ত বক্তার স্ত্রী কানন বক্তাও গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সময় কোনো রকমে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছে জলি বুনার্জির আগের স্বামীর পক্ষের মেয়ে চন্দনা বুনার্জি (৯)। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদরের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
রক্তাক্ত বসন্ত বক্তা ও তার মেয়ের লাশ উঠানের মধ্যে পড়ে ছিল। ঘরের মেঝেতে পাওয়া গেছে জলি ও তার মা লক্ষ্মীর লাশ। ঘরের এক কোণে আঁড়ার সঙ্গে ঝুলছিল হামলাকারী নির্মল কর্মকারের লাশ। পুলিশের বিভিন্ন টিম ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ ও লাশের সুরতহাল তৈরি করে। চা-বাগানের সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় নারী-পুরুষ চা-শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। মর্মস্পর্শী এ ঘটনায় শোকে স্তব্ধ চা-বাগানের শ্রমিক ও অন্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে নির্মল কর্মকার প্রথমে তার স্ত্রীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করেন। আক্রমণ ঠেকাতে এলে শাশুড়িকে এবং পরে দুই প্রতিবেশীকে কুপিয়ে জখম করেন। ঘটনাস্থলেই এই চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় গুরুতর আহত হন কানন বক্তা। পাল্লাথল চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া চন্দনা পালিয়ে গিয়ে চিত্কার দিলে আশপাশের শ্রমিকেরা এসে বাড়ি ঘেরাও করেন। এ অবস্থায় নির্মল পালিয়ে যেতে পারেননি। পরে ঘরের দরজা লাগিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ঘরের দরজা ভেঙে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়।
বাগানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দুই বছর আগে পাল্লাথল বাগানের বিষ্ণু বুনার্জির মেয়ে জলি বুনার্জিকে বিয়ে করেন নির্মল কর্মকার। জলিকে বিয়ে করে তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। চা-বাগানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো। বাগানের বাসিন্দা লতা রানী কর্মকার বলেন, ‘এই রকম ঘটনা কোনো দিন বাগানে ঘটেনি। সবাই শান্তিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করি। আমাদের বাপ-দাদা থেকে এই বাগানে। এ ঘটনায় আমরা স্তব্ধ। হত্যাকারী নির্মল এই বাগানের শ্রমিক ছিল না। জলিকে সে বিয়ে করে এখানে থাকত। তার মূল বাড়ি কোথায় কেউ জানত না।’
এদিকে এ ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বেঁচে যাওয়া জলি বুনার্জির আগের পক্ষের মেয়ে চন্দনা বুনার্জি। সে কারো সঙ্গেই কোনো কথা বলছে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কোনো এক অজানা শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে। এত হইচই, এত কোলাহল কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। নিহত জলির বাবা বিষ্ণু বুনার্জি বলেন, ‘মেয়ে আমাদের কথার বাইরে গিয়ে নির্মলকে বিয়ে করে। প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। দুই মাস ধরে আমি অন্য মেয়ের বাড়িতে থাকি। খবর পেয়ে আমি বাগানে এসে দেখি আমার স্ত্রী, মেয়েসহ সবার রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে।’ বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘাতক নির্মল কর্মকার দেড় বছর আগে জলি বুনার্জিকে বিয়ে করে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করে আসছিল। সে আমার বাগানের নিয়মিত কোনো চা-শ্রমিক নয়। এর আগে সে পার্শ্ববর্তী একটি চা-বাগানে ছিল।’
এদিকে খবর পেয়েই সকালে ঘটনাস্থলে যান মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার ফারুক আহমদ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া সুলতানা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পিবিআই) নজরুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) কাওছার দস্তগীর, থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়াছিনুল হক, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম প্রমুখ।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমদ বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে। রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেকক্ষণ ঝগড়া হয়েছিল, এটা শুনেছি। বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
