ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতাবোধ এমনই এক বিষয়, যাহা কেহই ত্যাগ করিতে চাহে না। যত আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের আহ্বান থাকুক না কেন, স্বাধীনতাবিহীন জীবন প্রতিটি মানুষের কাছেই অর্থহীন হইয়া যায়। ব্রিটিশ যুবরাজ, ডিউক অব সাসেক্স প্রিন্স হ্যারি যেই কারণেই হউক তাহার ব্যক্তিজীবনে স্বাধীনতার ঘাটতি অনুভব করিয়াছেন। সিদ্ধান্ত নিয়াছিলেন, রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করিয়া স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করিবেন। অনেক ঘটনাবলির পর অবশেষে তিনি তাহার উপর অর্পিত সমস্ত দায়িত্ব হইতে সরিয়া দাঁড়াইলেন। তিনি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করিয়া স্ত্রী-সন্তান লইয়া নিজে স্বাধীনভাবে বসবাসের ঘোষণা দিয়াছেন। রাজপ্রাসাদের বাঁধাধরা জীবন তাহার পোষাইবে না এবং এই প্রাসাদের জীবন তাহার কাছে ভিন্ন ধরনের পরাধীনতা বলিয়াই মনে হইয়াছে। ইহা হইল রাজপ্রাসাদের এক যুবরাজের স্বাধীন জীবন উপভোগের অন্তরায়ের ফল। হ্যারির এই সিদ্ধান্ত হইতে বুঝা যায়, রাজপ্রাসাদে বসবাসের চাইতে স্বাধীন জীবনযাপন মানুষের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায়, রাজপ্রাসাদ হইতে কুঁড়েঘর—সর্বস্তরের মানুষের যাপিত জীবনের অন্যতম চাওয়া হইল স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার জন্যই; বিশ্বব্যাপী ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের তথা জাতির স্বাধীনতার জন্য বহু মানুষ জীবন দিয়াছে, শহিদ হইয়াছে, এখনো দিয়া চলিয়াছে। আমরাও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনতাহীনতা অনুভব করিয়াছিলাম। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করিয়াছিল পরাধীনতা হইতে মুক্ত হইবার জন্য। তবে বুঝিতে হইবে, স্বাধীনতার অর্থ কেবল ভৌগোলিকভাবে অন্য জাতির নিকট হইতে মুক্ত হওয়া নহে। স্বাধীনতার অর্থ কথা বলিবার স্বাধীনতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রথা ও নিয়ম মানিয়া মুক্তভাবে চলিবার স্বাধীনতা। আমরা জানি, একটি আপাতদৃষ্টে স্বাধীন দেশের মানুষও পরাধীন হইতে পারে। যখন কোনো পরিবারে, কোনো প্রতিষ্ঠানে, কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে মুখ ফুটিয়া সত্য বলিবার অধিকার থাকে না তখন প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতাটাই থাকে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন যথার্থই বলিয়াছিলেন, ‘কাহারো স্বাধীনতা না থাকার অর্থ হইল একটি ভেড়ার কসাইখানায় অপেক্ষা করা।’
সুতরাং প্রতিটি রাষ্ট্রের উচিত ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করিবার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। নিঃসেন্দেহে স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা এক নহে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে দেখা যায় স্বেচ্ছাচারিতাকে সমাজ ঠাঁই দিলেও স্বাধীনতাকে সহ্য করিতে পারে না। যেইখানে মানুষ স্বাধীন থাকে না, সেইখানে রাষ্ট্রের স্বাধীনতারও যে কোনো মূল্য থাকে না—তাহা স্বাধীনতা হরণকারীরা বুঝিতে পারেন না। পশ্চিমা বিশ্বেও যে মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন হইয়াছে, তাহা বলা যাইবে না। কিন্তু যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলিতে একটি ন্যূনতম অবস্থা দাঁড়াইয়াছে যাহা হইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি অনেক দূরে অবস্থান করিতেছে। এই দেশগুলিকে ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতার ব্যাপারে অগ্রসর হইতে হইবে।
