>> আরফিন শরিয়ত
উনিশ শতকে মানুষের দোরগোড়ায় চিঠি পৌঁছে দিত ডাকপিয়নরা। একবিংশ শতাব্দীতে সেই ডাকপিয়নের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে হলেও এবার এ কাজের দায়িত্ব বর্তেছে পিয়নের ওপর। তবে এবারের দায়িত্ব নতুন। পিয়ন এখন আর চিঠি বহন করবে না। বইপোকাদের দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব বহন করছে। পাঠকের রুচিমতো যেকোনো বই দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সে। ‘এই পৃথিবী বইয়ের হোক’ স্লোগান নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে অনলাইনভিত্তিক এই বুকশপ।
পিয়নের উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান জয়। পিয়ন-এর এই স্বত্বাধিকারী জানান, ‘রাজধানীর নীলক্ষেতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ও দুষ্প্রাপ্য বই পাওয়া যায়, তা দেশের অন্য কোথাও পাওয়া খুবই কষ্টকর। নীলক্ষেত থেকে এসব বই সংগ্রহ করে ঢাকা এবং তার বাইরে বইপড়ুয়াদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।’
বন্ধুদের নিয়ে কলেজজীবন থেকে বড়ো লাইব্রেরির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। নিজের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় প্রায় ১০ লাখ লোক বাস করে। কিন্তু এই এলাকায় কোনো বড়ো লাইব্রেরি নেই। আমরা বুঝলাম, এই লোকগুলোর মানসিকতা পরিবর্তন করতে হলে লাইব্রেরি লাগবে, বই পড়া শেখাতে হবে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, চট্টগ্রামে অনেক বিশাল মার্কেট আছে। প্রায় সবগুলো মার্কেটে এসি আছে। হাতের নাগালে সবকিছু পাওয়া যায়। কিন্তু লাইব্রেরি পাওয়া যায় না। আমার স্বপ্ন ছিল ২০তলা লাইব্রেরি বানানোর।’
স্বপ্ন দেখা নিয়ে বসে থাকেননি এই শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শুরু করেন ‘পিয়ন’। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিজের স্বপ্ন দেখা শুরু করেন কলেজজীবন থেকেই। কলেজের সময়গুলো পার করার সময় দেখলেন এখানে বড়ো কোনো বইয়ের বাজার নেই। আন্দরকিল্লায় কিছু বইয়ের দোকান থাকলেও ভালো বইয়ের দোকান নেই। এখানকার তরুণদের বই পড়ানো শেখাতে হলে প্রয়োজনীয় বই ঢাকা থেকে এনে এখানে ছড়িয়ে দিতে হবে।
নিজের সাফল্যের গাথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে কার্যক্রম শুরু করি ৮ হাজার টাকার বই দিয়ে। আমরা চার বন্ধু মিলে এ ব্যবসা শুরু করি। আমাদের চিন্তা ছিল, আমরা চার জনে ২ হাজার টাকা করে দিয়ে বই কিনব। বিক্রি না হলে ভাগাভাগি করে নিয়ে নেব। কিন্তু প্রথম মাসের সাফল্যে আমরা অবাক। আমরা দেখলাম যে, প্রথম মাসেই আমরা ১২ বা ১৪ হাজার টাকার অর্ডার পেয়েছি। শুরুটা আমাদের ছিল ৪ হাজার টাকা দিয়ে। এখন আমরা ৪০ হাজার টাকার একটা কোম্পানি। এই বছরের মধ্যে আমাদের লক্ষ্য ১ লাখ টাকা অতিক্রম করা।’
শুধু সাফল্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প তাদের নয়। প্রকৃতির নিয়মেই কালের মোড় ঘুরে যায়। তাদের আকাঙ্ক্ষার মোড় ঘুরে হতাশায় পরিণত হয়েছিল। হতাশার গল্প বলতে গিয়ে চোখের কোণায় একটু অশ্রু এসেছিল তার। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় মাসেই আমাদের বই বিক্রি হয় মাত্র ২ হাজার টাকার। মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তখনই, যখন আমাদের একজন হাল ছেড়ে দেয়। তাতে আরো বেশি হতাশায় পড়ে যাই।’ কিন্তু না, নিজেদের ওপর অবিচল বিশ্বাস রেখে আবার দাঁড়াতে পেরেছিল পিয়ন।
মাত্র ২০ টাকা ডেলিভারি চার্জে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, আইআইইউসি, পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে বই ডেলিভারি দিয়ে থাকেন বলে জানান জয়। এছাড়া ঢাকার শাহবাগ মোড়, নিউমার্কেট মোড়, আজিমপুর এবং চট্টগ্রামের নিউমার্কেট মোড়, হালিশহর, চকবাজার কেয়েরির সামনে, জামালখান মোড়, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ মোড়, আগ্রাবাদ সিডিএ, বড়োপোল মোড়, নয়াবাজার মোড়, এ.কে. খান মোড়, ফ্রি পোর্ট মোড়, কাটগড় এলাকায় একই চার্জে বই পৌঁছে দেয় পিয়ন।
অনলাইনে বই অর্ডার দেওয়া যাবে উদ্যোক্তাদের ফেসবুক পেজ Peon-এর মাধ্যমে। পেজে কমেন্টস করে, পেজের নম্বরে কল দিয়ে কিংবা মেসেজ দিয়েও বইয়ের অর্ডার দেওয়া যাবে।
