পল্টু ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হবেন। এক হালি বার বিসিএস পরীক্ষাও দিয়েছেন। প্রথমবার প্রথম বলেই বোল্ড। মানে প্রিলিতেই ফেল। দ্বিতীয়বার প্রথম বলে ছক্কা কিন্তু দ্বিতীয় বলে কট। মানে প্রিলিতে টিকলেও রিটেনে ফেল। তৃতীয়বার তৃতীয় বলে রান আউট। মানে প্রিলিতে ও রিটেনে পাস করলেও ভাইভাতে ফেল। চতুর্থবার দুঃখজনকভাবে টাইম আউট। ঘটনা হলো প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় রিটেন পরীক্ষা দিতে পারেননি। সেদিনই পল্টু ভাইয়ের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নটা কাচের প্লেটের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় স্বপ্না আপাকে পাওয়ার স্বপ্নটাও। কেননা ততদিনে স্বপ্না আপা বিসিএস ক্যাডার। সামাজিক ব্যবধানটা সুস্পষ্ট। পল্টু ভাই হতাশ। বয়স তিরিশ ছুঁই-ছুঁই। ঘুম হারাম করা এত দিনের প্রস্তুতি কাজে লাগানোর আর সুযোগ নেই। আমরা বললাম, ‘ভাই, একটা ব্রিলিয়ান্ট মেয়েকে বিয়ে করুন। আপনি হেল্প করলে সে বিসিএস পাবে। বউয়ের বিসিএস পাওয়া আর আপনার বিসিএস পাওয়া একই কথা।’ ‘বুদ্ধিটা মন্দ না,’ পল্টু ভাই বললেন। বিয়ের চেষ্টাও করলেন কিছু দিন। কিন্তু বেকার ছেলের কাছে ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে দূরের কথা গাধা মেয়েকেও কেউ বিয়ে দিতে চায় না। অবশেষে চেষ্টার ইতি টানলেন পল্টু ভাই। আত্মকর্মসংস্থানের পরিকল্পনা শুরু করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, দুগ্ধজাত গাভির খামার দেবেন। আমরা বললাম, ‘দারুণ আইডিয়া ভাই, বর্তমানে দুধের বেশ চাহিদা। দেখেন না, শহরে এক কাপ গরুর দুধের চায়ের দাম দশ টাকা। তারপরও সব জায়গায় পাওয়া যায় না! আপনি খামার দিলে আমরা অন্তত আরামে দুধ চা’টা খেতে পারব।’ কিন্তু খামারের জন্য চাই মূলধন। পল্টু ভাই বেশ ঘুরলেন ব্যাংক লোনের জন্য। কিন্তু লোন পেলেন না। অগত্যা পল্টু ভাই যে কয় মাস আছে তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেওয়া শুরু করলেন। ভাইভাতে ডাক পড়ল। এতদিন সনদের ফটোকপি সত্যায়িত করার কাজটা কলেজের স্যারের মাধ্যমেই করাতেন। বিসিএস দিচ্ছেন শুনে স্যার দারুণ খুশি হতেন। কিন্তু এবার তিনি স্যারের কাছে গেলেন না। উপজেলার এক কর্মকর্তার কাছে গেলেন। কর্মকর্তা চেয়ারে বসে মোবাইল টিপছিলেন। মোবাইলে ফেসবুক চালানোকে কাজ বলা যায় না। রুমে ঢোকার অনুমতি চাইলেন পল্টু ভাই। অফিসার প্রশ্ন করলেন, ‘ভিতরে কেন আসবেন?’ বিনয়ের সঙ্গে পল্টু ভাই বললেন, ‘কিছু কাগজ সত্যায়িত করা লাগবে।’ ‘এখন সত্যায়িত করে দিতে পারব না, পড়ে আসেন,’ অফিসার বললেন। পল্টু ভাই অসহায়ের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন ওদিকে যাচ্ছিল পটলা ভাই। পটলা ভাই পল্টু ভাইয়ের স্কুল ফ্রেন্ড। স্কুলে সে লাস্ট বয় বলে পরিচিত ছিল, এখন উপজেলায় রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
—আরে দোস্ত, এখানে ক্যান?
—কিছু কাগজ সত্যায়িত করাতে এসেছি।
—কাগজ সত্যায়িত করাবি তো বাইরে ক্যান, চল ভিতরে চল।
পটলা ভাই কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ভিতরে ঢুকে গেল। বাধ্য ছেলের মতো অফিসার কাগজগুলো সত্যায়িত করে দিলেন। পরদিন ভাইভা ছিল। কিন্তু পল্টু ভাই গেলেন না। তিনি ঘোষণা দিলেন, যে গর্দভ চাকরিদাতারা মূল কাগজ দেখানো সত্ত্বেও সত্যায়িত ফটোকপি ছাড়া ভাইভা নিতে পারে না, তাদের চাকরি তিনি করবেন না। তিনি এবার ওয়ার্ড কমিশনার পদে নির্বাচন করবেন। যেই কথা সেই কাজ। পল্টু ভাই নেমে পড়লেন নির্বাচনী কাজে। আমরা তার কর্মী ও উপদেষ্টা নিযুক্ত হলাম। বাড়িতে জনতার ঢল পড়ে গেল। তাদের চা-সিগারেট খাওয়ানোর টাকা জোগাতে পল্টু ভাইয়ের টিউশনির টাকায় কেনা মোবাইল ফোনটা বিক্রি করে দিতে হলো। নির্বাচনী খরচ কমানোর উপায় বের করার দায়িত্ব পড়ল আমাদের ওপর। আমরা সিগারেটের বিরুদ্ধে স্লোগান বের করলাম। কিন্তু চায়ের খরচ কমানোর উপায় পেলাম না। সে উপায় বের করল বোটানির ছাত্র বদরুল ভাই। সে পল্টু ভাইয়ের পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি দেখলেন, পুরোনো খড় পানিতে ডুবালে চায়ের কালার হয়ে যায়। তাতে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিলে কারও বুঝায় উপায় নেই যে এটা খড়-চা ।
—এটা কোনো নীতির কথা?
ক্ষেপে গেলেন পল্টু ভাই।
—এখন এই ‘অনীতি’ না করলে পরে তোকে করতে হবে গম চুরি। পল্টু ভাইয়ের যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা ইংরেজির শাহীন ভাই বললেন।
—আরে বেটা, যেখানে অনিয়মই নিয়ম হয়ে যায়, সেখানে সত্য আর সত্যবাদীরা সকাল-বিকেল থাপ্পড় খায়।
পল্টু ভাইয়ের অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা অর্থনীতির নূর ভাই বললেন।
নূর ভাইয়ের কথায় দমে গেলেন পল্টু ভাই। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ঠিকই বলেছিস, আমার মা সত্যবাদী ছিলেন। স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করানোর সময় আমার আসল জন্ম তারিখ ও সালটাই দিয়েছিলেন। বন্ধুরা দিয়েছিল বয়স দুই-তিন বছর করে কমিয়ে। মা বলেছিলেন, মিথ্যে দিয়ে জীবন শুরু করবি ক্যান বাবা! বন্ধুরা আরও কয়েকবার বিসিএসের চেষ্টা করতে পারবে। আমি পারব না। যা, খড়-চা গ্র্যান্টেড।’ লোকে বলে, মানুষ মাগনা পেলে আলকাতরাও খায়। আর আমরা দেখলাম, খড়-চাও খায়। বেহুঁশের মতোই খায়। কিছু বুঝতেই পারে না। পল্টু ভাই এখন পুরোদমে রাজনীতিবিদ। আর খড়-চায়ের আবিষ্কারক বদরুল ভাই তার অন্যতম উপদেষ্টা। আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত গুণী ব্যক্তি। আর লোকে বলে, পল্টু ভাই জন্মগত রাজনীতিবিদ। তবে ফেসবুক ঘাঁটলে এখনো পাওয়া যাবে তার দেয়া পুরোনো স্ট্যাটাস—আই হেইট পলিটিক্স!
ফুলপুর, ময়মনসিংহ
