সামনে ইউপি নির্বাচন। ভেদরকান্দি গ্রামবাসীর এক অংশ বর্তমান মেম্বরের প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট নয়। গেল পাঁচ বছরে গ্রামের কোনো কাজে তাকে বাটি চালনা করেও পাওয়া যায়নি। উল্টো বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সরকারি যত টাকা আসছে, সবই হজম করেছে। প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে যায়নি। ভোট আসছে। ব্যালট যুদ্ধে বর্তমান মেম্বরকে জব্দ করার এই একমাত্র সুযোগ। অবশ্য ভোট নিয়ে শঙ্কাও আছে। আজকাল তো আর ভোট ব্যবস্থা আগের মতো নেই। ভোট হয় নামে মাত্র। ভোটের আগেই প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবুও একটুখানি আশার আলো খোঁজে, ভেদরকান্দি গ্রামবাসীর ভালো-মন্দের কথা ভাবে এমন একটি অংশ।
কিছুদিন হলো গ্রামের শিক্ষিত যুবকেরা মিলে ‘আদর্শ ক্লাব’ নামে একটি ক্লাব তৈরি করেছে। গ্রামের মানুষের ভালো-মন্দে পাশে থাকার প্রত্যয় নিয়ে ক্লাবটি গঠন করা হয়। ক্লাবের প্রত্যেক সদস্যই গ্রামের মানুষের ছোট-বড় সমস্যা সমাধানে একক অথবা প্রয়োজনে সমষ্টিগতভাবে সব সময় এগিয়ে যায়। বর্তমান মেম্বর ছলু মিয়া বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নিতে পারেনি। ক্লাবের যুবকগুলো মেম্বরকে মোটেও তোয়াক্কা করছে না দেখে তার গায়ে জ্বালা ধরে যায়। নিজের অপকর্মগুলো না শুধরিয়ে উল্টো ক্লাব ঘরটি উঠিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু গ্রামবাসীর তোপের মুখে সে ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়। গ্রামবাসীর একটি অংশ ক্লাবের যুবকদের সঙ্গে আসছে ইউপি নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসে। সিদ্ধান্ত হয় ছলু মিয়ার বিপরীতে ক্লাবের পক্ষ থেকে একজন মেম্বার প্রার্থী দাঁড় করানোর। শুরু হয় প্রার্থী খোঁজা। কিন্তু ছলু মিয়ার বিপরীতে কাকে মনোনয়ন দেওয়া যায়? ক্লাবের যুবকদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়, ছলু মিয়াকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এমন একজন প্রার্থীকে দিতে হবে যে মেম্বার হওয়ার যোগ্য নয়। আমরা ক্লাববাসী পরিশ্রম করে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে তাকেই নির্বাচিত করে ছলু মিয়াকে উচিত শিক্ষা দিতে চাই। তার বিপরীতে নির্বাচিত হতে কোনো হেবিওয়েট প্রার্থীর প্রয়োজন নেই। অবশেষে খুঁজে খুঁজে সবার সম্মতি ক্রমে মাছ বিক্রেতা কাদের মিয়াকে নির্বাচন করা হলো। কাদের মিয়া মাছ বিক্রি করলেও গ্রামের পরিচিত মুখ। কাদের মিয়া কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি গ্রামবাসী কোনোদিন তাকে মেম্বার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড় করাবে। প্রথমে সে অস্বস্তিবোধ করলেও পরে ক্লাবের যুবকদের আশ্বাসে রাজি হয়। নির্বাচন অফিসে প্রার্থী ফরম জমা দেওয়ার দিন কাদের মিয়া সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়ে ক্লাবের যুবকদেরসহ গ্রামের লোকদের বড় একটি অংশ নিয়ে উপজেলা নির্বাচন অফিসে হাজির হলো। এদিকে কাদেরের শোডাউন দেখে ছলু মিয়ার মাথা নষ্ট প্রায়। তার বিপরীতে একজন মাছ বিক্রেতাকে দাঁড় করানো হয়েছে। রাগে ক্ষোভে নিজের চুল নিজে টেনে ছিড়তে থাকে।
শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা। সারা গ্রাম কাদের মিয়ার পোস্টারে ছেয়ে দেওয়া হয়। ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো হয়। মাইকিং চলে সারাবেলা—আমার ভাই, তোমার ভাই, কাদের ভাই, কাদের ভাই। কাদের ভাইয়ের মার্কা, আনারস মার্কা। কাদের ভাইকে দিলে ভোট, শান্তি পাবে গাঁয়ের লোক। মা-বোনদের বলে যাই, আনারস মার্কায় ভোট চাই। কাদের ভাই চান কি? গরিব দুঃখির শান্তি। উড়ছে পাখি দিচ্ছে ডাক, কাদের ভাই জিতে যাক। সুন্দরবনে বাঘের ডাক, আনারস মার্কা জিতে যাক।
কাদের ভাই কিন্তু মাছ বেচা বন্ধ করেননি। সকাল থেকে দুপুর অবধি মাছ বিক্রি করে। বিকেলে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ক্লাবের যুবকদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রচারণায়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবার কাছে ভোট প্রার্থনা করে। গাঁয়ের এমন কোনো ঘর নেই যেখানে তার দু-চারবার করে যাওয়া হয়নি। সকলেই আশ্বস্ত করে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করে দেয়। সবার কণ্ঠে একই সুর—ভোট যদি দিতে হয় কাদেরকেই দেব। কাদের মিয়ার তবু শঙ্কা কাটে না। আমার মতো মানুষকে আসলেই কি গ্রামবাসী ভোট দেবে! কী জানি! নিজেই আবার সান্ত্বনা খুঁজে নেয়, যা হওয়ার হবে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী!
ভোটের দুদিন আগে জনসভার আয়োজন করা হয়। ক্লাবের যুবকদল কাদের মিয়াকে শিখিয়ে দেয় কীভাবে নির্বাচনী বক্তৃতা দিতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক। জনসভায় অন্যান্য সবার বক্তৃতা শেষে মেম্বর প্রার্থী কাদের মিয়াকে বলা হয় গ্রামবাসীর উদ্দেশে তার মূল্যবান বক্তব্য দেওয়ার জন্য। কাদের মিয়া মঞ্চে উঠে মাইকের সামনে দাঁড়াতেই একসঙ্গে এত লোক দেখে তার হাঁটু কাঁপা শুরু হয়ে যায়। ক্লাবের যুবকদল যা কিছু শিখিয়ে দিয়েছিল সব গুলিয়ে ফেলে। কোনো মতে সবার উদ্দেশে সালাম দিয়ে বলল, ‘আমাকে যদি ভোট দেন, কথা দিচ্ছি আজ থেকে আমি বিড়ি খাওয়া ছেড়ে দেব।’ জনসভাজুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়। কাদের মিয়া বলে, ‘এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।’ পরবর্তীতে উপস্থাপক এসে মাইক ধরে পরিস্থিতি সামাল দেন।
অতঃপর ভোটের দিন এল। ক্লাবের যুবকরা ক্লাবের ফান্ডের টাকা দিয়ে একশত রিকশা ঠিক করে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের রিকশায় করে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ভোট শেষে আবার বাড়ি পৌঁছে দেয়। এদিকে কাদের মিয়ার পক্ষে ভোটারদের এত উত্সাহ দেখে ছলু মিয়ার চান্দি গরম হয়ে যায়। সে উপরমহলে নানা লবিং শুরু করে। জেলা শহর থেকে বখাটে মাস্তান এনে ভোটকেন্দ্রগুলো ঘেরাও করে। বিকেল পাঁচটার পরে শুরু হয় ভোট গণনা। রাত নটায় সব কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছলু মিয়াকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। গ্রামবাসী দলে দলে কাদের মিয়ার বাড়িতে উপস্থিত হয়। সবাই প্রতিবাদ করে। আমরা এই ফলাফল মানি না। আমাদের মেম্বার কাদের মিয়া। এদিকে ছলু মিয়ার বাড়িতে নিজের সাঙ্গপাঙ্গ ছাড়া আর কেউ আসে না। নিজেরা নিজেরা বিজয়ের মালা পরে উচ্ছ্বাস করে। কাদের মিয়া বিজয়ী না হলেও তার বাড়ি ফুলে ফুলে ভরে যায়। সবাই তাকে কাদের মেম্বার, কাদের মেম্বার বলে ডাকতে শুরু করে। ছলু মিয়া আসে বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে কাদের মিয়ার বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে। কাদের মিয়ার বাড়ির কোলাহল দেখে ছলু মিয়া আকাশ থেকে পড়ে। ছলু মিয়া কাদের মিয়ার হাতে মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দেয় আর বলল, ‘ও কাদের মিয়া! কী কেরামতি দেখাইলা। নির্বাচিত হইলাম আমি আর লোকে তোমারে মেম্বার ডাকে!’
কাদের মিয়া মুচকি হাসে। ছলু মিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘টাকা দিয়া নির্বাচনের ফল পাল্টানো যায়, গাঁয়ের মানুষ কেনা যায় না।’
তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
