আমাদের সহকর্মী রোমেল ভাই এই চল্লিশে এসেও কুমার। মানে একবচন আর কি। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। সময় ও স্রোতের মতোই সহোদরদের কেউ তার জন্য অপেক্ষায় থাকেনি। সময়ের অনুকূলে তরী বেয়েছেন বলেই তারা সবাই-ই আজ ব্যক্তিগত জীবনে বহুবচন। তবে এ নিয়ে আমরা কখনো রোমেল ভাইকে আফসোস করতে দেখিনি। আর এখন তো তিনি বিয়ের প্রশ্নে চিরকুমার থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। কাজের চাপ একটু কম থাকায় সেদিন দুপুরের খাবারের পর সবাই মিলে চা নিয়ে কর্মস্থলস্থ ক্যাফেটোরিয়ায় বসেছি। সহকর্মীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ও ঠোঁটকাটা স্বভাবের মুক্তা প্রসঙ্গ পালটে হঠাত্ রোমেল ভাইকে জিজ্ঞেস করে বসে বিয়ে না করার অন্তরালের গোমড় সম্বন্ধে। রোমেল ভাই শুনেও না শোনার ভান করে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু আমরা যে নাছোড়বান্দা। আমাদের সম্মিলিত আক্রমণে রোমেল ভাইয়ের গাইগুই খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। বাইন মাছের মতো খানিকক্ষণ মোচড়ামুচড়ি করে অতঃপর ঝেড়ে কাশলেন। এবার তিনিই কথক। ‘বেশ, শোনো তাহলে। বনেদি ঘরের বড় ছেলে হওয়ায় পঁচিশের কোঠা পেড়োতে না পেড়োতেই মা-বাবা পাত্রীর সন্ধানে লেগে পড়লেন। পরিবারের প্রথম বউয়ের যোগ্যতার আবশ্যিক শর্তের তালিকাটা একটু লম্বাও হলো। যথারীতি নানা জায়গা হতে বিবাহযোগ্যাদের সংবাদ হুড়মুড় করে আসতে লাগল। কিন্তু আব্যশিক শর্ত পূরণ হয় না। রং মিললে বংশে জং, আবার বংশ বর্ণিল হলে রং মলিন। এ ছাড়া লম্বা বা খাটো, মোটা বা চিকন, লম্বা চুলো বা খাটো চুলো, সোজা চুলো বা কোকড়া চুলো, উঁচু দাঁত বা নিচু দাঁত, জোড়া ভ্রু বা বেজোড় ভ্রু, বড় কপালে বা ছোট কপালে, ছোট গলা বা বড় গলা, ছোট পাওয়ালা বা বড় পাওয়ালা ইত্যাদি আরও কত কী! অর্ধযুগে প্রায় দুই ডজন কনে দর্শন করেও কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি (?) খুঁজে পেতে ব্যর্থ হতে হয়। আমি বিয়ের সিংহভাগ আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কোনো কনের সংবাদ আসলে সেদিন আর বাসায় ফেরা হয় না। আমার প্রিয় একটা নদী আছে যেটা আজ বয়সের ভারে আর দখলের ভিড়ে মুমূর্ষু অবস্থায়। তখনো তার যৌবন ছিল। সে নদীর তীরে বসে পাত্রী দেখতে যাওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতাম। বছর দুই বাদে একদিন ছোট মামা একটা ছবি নিয়ে হাজির হন। খানিকটা অনীহা নিয়েই দেখি। কিন্তু দেখে তো চোখ চড়কগাছ। সব শর্তই যেন এখানে এসে মিশেছে। বংশও বর্ণিল। মা-বাবা খুশিতে আটখানা। সবাইকে বেশ ঘটা করে জানিয়ে দেওয়া হলো পাত্রী দেখতে যাওয়ার দিনক্ষণ। কাগজে লিখে লিখে দেখতে যাওয়ার দলের তালিকা করা হলো। আমারও যে একটু লজ্জার মতো করেনি তা কিন্তু নয়। ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে গেছে। স্রোত যেন একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। যাই যাই করেও যাচ্ছে না বেয়াড়া সময়। কয়েক যুগ অতিবাহিত করে পূর্বনির্ধারিত দিন এল অতঃপর। সূর্যোদয়ের পর থেকেই উড়ুউড়ু মনে মৃদু শিহরণ। মনের অলিন্দে নানা কথার উঁকিঝুঁকি। মনে আছে সাড়ে নয়টার দিকেই বেড়িয়ে পড়েছিলাম। একটা নির্বাচনী মিছিল যেন। মধ্যমণি আমি। বাহন ঠিক করাই ছিল। মিনিট চল্লিশের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পাত্রীর বাড়িতে। তারাও আমাদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন। পাত্রী তো আমাদের পছন্দই। তাই মায়ের ছোট ব্যাগে বাগদান অঙ্গুরীয়ও উপস্থিত। যথারীতি পরি সেজে পাত্রী আসে। সৌন্দর্য দেবী ভেনাস যেন ধরায়। প্রশংসার দৃষ্টিতে সবাই সৌন্দর্য গিলছে। মা উঠে বাগদান অঙ্গুরীয় পড়ালেন। তৃপ্তি মিশ্রিত আনন্দের একটা মৃদু বায়ু দ্রুত লয়ে প্রবাহিত হলো। ঘটনা সেদিনের মতো এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু চমক কিঞ্চিত্ বাকি যে! মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করল। মা বুকে টেনে নিলেন। তখনই আঙ্গুল হতে বাগদান অঙ্গুরীয় খুলে মায়ের হাতে দিল। উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে হতবাক। সুমধুর কণ্ঠে বলে উঠল, ‘দুঃখিত মা। আমি আপনাদের পরিবারে যেতে আগ্রহী নই। আপনারা আমার যোগ্য নন। আপনাদের পাত্রী নির্বাচনের মাপকাঠিতে সম্ভবত মানুষের বাহ্যিক দিকটাকে সম্পূর্ণ প্রাধান্য দিয়েছেন। না হলে শুধু শ্যাম বর্ণের কারণে একজন কন্যাদায়গ্রস্ত আশাবাদী পিতাকে হতাশ করতেন না।’ ‘তুমি কী বলছো এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না !’ মা আর বিস্ময় চেপে রাখতে পারলেন না। ‘মনে পড়ে দেখতে অসুন্দর নয়, শুধু শ্যাম বর্ণ বলে আপনারা আমার খালাতো বোনকে তার বাবার মুখের ওপর না বলেছিলেন? পছন্দ হয়নি ভালো কথা, সেটা পরে লোক মারফত জানিয়ে দিলেও তো পারতেন।’ বলে পাত্রী অন্দরমহলে প্রস্থান করল। এরপর বিয়ের প্রতি যে অনাগ্রহ জন্মেছে তা আজও বর্তমান। আর পাত্রী নির্বাচন মুখো হইনি।’ দম নেন রোমেল ভাই।
