তিনটি রম্য

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৬

নীরব চন্দন, উলিপুর, কুড়িগ্রাম

হোম মিনিস্টার

 

আরিফ আমার কলিগ হলেও সম্পর্কটা বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। আরিফ একজন বউভিতু ছেলে। বউয়ের কথায় ওঠা-বসা করা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বিষয়টি নিয়ে আরিফকে অনেক বুঝানো হয়েছে। বউকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? বউ তো বাঘ নয়। কিন্তু আরিফের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আরিফের মতে, তার বউ বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। অন্যদিকে আরিফ রাজনীতি করে। বড় বড় নেতা, এমপি-মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ আছে তার। একদিন অফিস শেষে আরিফসহ আমরা কয়েকজন কলিগ মিলে চা খাচ্ছিলাম। আরিফের মোবাইলটা নিয়ে আমি একটা ভিডিও শেয়ার করে নিচ্ছিলাম। কলিগরা সবাই তখন গল্পে মজে গেছে। হঠাত্ আরিফ বলল, ‘আমার জরুরি টয়লেট যেতে হবে।’ কথাটা বলেই আরিফ হনহন করে পাশের টয়লেটে চলে গেল। কিন্তু আরিফের মোবাইলটা আমার কাছেই রয়ে গেল। এর প্রায় দুই-তিন মিনিট পর আরিফের মোবাইলের রিং বেজে উঠল। মোবাইলের স্কিনে তাকিয়ে দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। নামটা দেখে উপস্থিত সকলেই চমকে গেল। কেউ কেউ তো অস্থির হয়ে আরিফের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগল। বেটা, আরিফ টয়লেটে যাওয়ার আর সময় পেল না? হোম মিনিস্টাররের ফোন রিসিভ না করেই টয়লেটে চলে গেল? কত বড় সাহস? মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা ছিল হোম মিনিস্টারের নামে। মোবাইলের রিংটোনটা ততক্ষণে বাজা বন্ধ হয়ে গেছে। পুনঃরায় রিংটোন বাজতে শুরু করল। কিন্তু তখনো আরিফের কোনো পাত্তা নেই। এবার আমরা আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে গেলাম। উত্তেজিত হয়ে আমরা আরিফের টয়লেটের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে বললাম, ‘আরিফ আপনার জরুরি ফোন এসেছে। তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসুন প্লিজ।’ আরিফ ভিতর থেকেই বলল, ‘সমস্যা নেই। যার ফোনেই হোক আগে ভালোভাবে কাজ শেষ করব, তারপর বের হব।’ আমরা আর ধৈর্য ধরতে পারলাম না। প্রচণ্ড চিত্কার-চেঁচামেচি শুরু করে দিলাম। এবার আরিফ টয়লেট থেকে বের হয়ে এসে বলল, ‘কী হয়েছে? এত চেঁচামেচি করছেন কেন?’

—আপনাকে হোম মিনিস্টার ফোন দিয়েছে। দ্রুত কথা বলুন।

—এটা কোনো বিষয়ই না। দেরি করে ফোন দিলেও হবে।

—মানে কী? একজন হোম মিনিস্টারের আপনার কাছে কোনো গুরুত্ব নেই?

—আরে ভাই, ওটা তো সেই হোম মিনিস্টার না।

—তাহলে কোন হোম মিনিস্টার?

—ওটা আমার বউ। আপনাদের ভাবি। ওর নামটা আমি হোম মিনিস্টার নামে সেভ করে রেখেছি।

—ধুর মিয়া, আগে বলবেন না। এভাবে কেউ নাম সেভ করে রাখে? আমরা তো ভেবেছিলাম কি না কি?

 

সবাই আরিফের উপর প্রচণ্ড রাগে গজগজ করতে লাগল। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। এর একটু পর আরিফের মোবাইলে আবারও কল এল। এবার ফুড মিনিস্টার নামে। বি.দ্র. ফুড মিনিস্টার আরিফের বাবা।

০০০

আসন বণ্টন

নির্বাচনী হাওয়া ঈশিকার গায়েও লেগেছে। ফলে ঈশিকা তার মনের আসন বণ্টন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঈশিকা নিজেকে তার এলাকার সবচেয়ে সুন্দরী ও স্মার্ট গার্ল মনে করে। অবশ্য মনে করার অনেক কারণও আছে। সবেমাত্র কলেজের বারান্দায় পা দিয়েছে ঈশিকা। এরই মধ্যে প্রায় তিন ডজনেরও বেশি প্রেমের অফার পেয়েছে সে। এলাকার কালু থেকে শুরু করে লালু, ধলু সবাই ঈশিকার রূপে পাগল। ঈশিকা খুব উদার মনের মানুষ। সে কাউকে নিরাশ করতে চায় না। কিন্তু তবুও কিছু যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। কেননা ঈশিকার মনের আসন সংখ্যা মাত্র দশটি। কিন্তু এই দশটি আসনের বিপরীতে মনোনয়ন ফরম জমা পড়েছে বত্রিশটি। এমন অবস্থায় একটা উপায়-ই আছে। তা হলো মনের আসন বণ্টন করা। ঈশিকা সিদ্ধান্ত নিল, জমাকৃত আবেদন থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে দশটি আসনের জন্য প্রার্থী অর্থাত্ প্রেমিকা মনোনয়ন দেবে। তাই আবেদনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশটিতে নামিয়ে আনা হলো। নির্ধারিত দিনে বিশজন রোমিও প্রার্থীকে সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হলো। সকল প্রার্থী উপস্থিত। সবাই খুবই আত্মবিশ্বাসী, ঈশিকার মনের আসনে ঠাঁই হবেই হবে। সকলে অপেক্ষা করছে। প্রায় তিন ঘণ্টা পাড় হয়ে গেল। কিন্তু ঈশিকার কোনো দেখা মিলল না। এভাবে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর ঈশিকা উপস্থিত হলো। ঈশিকাকে দেখেই সবাই টাস্কি খেয়ে গেল। ঈশিকাকে আজকে যেন আরও বেশি সুন্দর লাগছে। সাক্ষাত্কার শুরু হয়ে গেল। এক-এক করে বিশ জনেই সাক্ষাত্কার দিয়ে ঈশিকার রুম থেকে বের হয়ে এল। কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কোনোরকম কথা বলছে না। একেবারেই নিশ্চুপ। সবাই এক সঙ্গে চুপ থাকার কারণ কী? কারণ ঈশিকার অদ্ভুত শর্ত। ঈশিকা শর্ত দিয়েছে, যে দশজন মনোনীত হবে, তাদের প্রতিদিন ভোর বেলা ঈশিকার সঙ্গে দেখা করে একশত বার ‘আই লাভ ইউ’ বলতে হবে। কিন্তু এমন সহজ শর্তে সবাই এত ভয় পাওয়ার কারণ কী? কারণ সবাই ঈশিকার জন্য জীবন দিতে পারলেও ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতে পারবে না। তাদের কাছে ভোর বেলা ঘুম থেকে ওঠা একেবারেই অসম্ভব। কী করা যায়—ভাবতে লাগল প্রার্থীরা। অবশেষে তারা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাল—শর্ত পরিবর্তনের দাবি জানাবে তারা। দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ারও প্রস্তুতি নিল প্রার্থীরা। কিন্তু প্রার্থীদের দাবির সঙ্গে ঈশিকা একমত হতে পারল না। ঈশিকা আরও কঠোর গলায় বলল, ‘আগামীকাল ভোরবেলা আমি অপেক্ষায় থাকব, যারা আসতে পারবে তারাই আমার মনের আসন পাবে।’ পরের দিন ভোরবেলা। প্রার্থীরা সবাই ঈশিকার বাসার সামনে উপস্থিত। সকাল নয়টা বেজে গেল। কিন্তু ঈশিকার কোনো দেখা নেই। পরে খোঁজ নিয়ে যা জানা গেল, ঈশিকা তখনো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কারণ ঈশিকা মনোনিত দশ জনের পকেট থেকে কিভাবে টাকা খসানো যায়, তা নিয়েই সারারাত গবেষণা করে ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়েছে।

০০০

এক ভোট

আমার ছোট চাচা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার পদে প্রতিবারই নির্বাচন করেন। কিন্তু কখনো জয়ী হতে পারেন না। চাচা প্রতিবারেই অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। কিন্তু চাচা দমে যাওয়ার লোক নন। চাচা আবারও নির্বাচনে প্রার্থী হলেন। আমরা সবাই এবার বেশ আত্মবিশ্বাসী চাচাকে যে করেই হোক জয়ী করব। চাচাও খুব খুশি। এবার জয় নিশ্চিত। যথারীতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচন শেষে ভোট গণনা শুরু হলো। সবার মধ্যে টানটান উত্তেজনা। আমরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়। অবশেষে ফলাফল ঘোষণা করা হলো। কিন্তু চাচা এবারও হেরে গেলেন। এবার তিনি পরাজিত হয়েছেন মাত্র এক ভোটে। চাচার খুব মন খারাপ। চাচাসহ আমরা সবাই একটা ফাঁকা মাঠে বসে আছি। কেউ কিছু বলছে না। হঠাত্ চাচা বলে উঠলেন, ‘এবার তো আমার হিসাব করা ভোট! তবুও এক ভোটে হারলাম কিভাবে? আমাদের মধ্যে কে ভোট দেয়নি? কে এই মীরজাফর?’

আমরা সবাই চাচার কথার সঙ্গে একমত হলাম। কে এই মীরজাফর? এরেই মধ্যে চাচা ঘোষণা দিলেন, ‘যে এই মীরজাফরকে ধরিয়ে দিতে পারবে, তাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। আর ওই মীরজাফরের শাস্তি হবে, মাথা ন্যাড়া করে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা।’

আমরা সবাই তাকে খোঁজা শুরু করে দিলাম। পরের দিন চাচা আবার সবাইকে একসঙ্গে ডাকলেন। সবাই উপস্থিত হলে চাচা বললেন, ‘মীরজাফরকে খুঁজে পাওয়া গেছে?’

আমরা বললাম, ‘না এখনো পাওয়া যায়নি। তবে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তা ছাড়া এত অস্থিরতারও কিছু নাই।’

চাচা সম্ভবত আমাদের উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। চাচা চিত্কার করে উঠে বললেন, ‘আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। আর তোমরা বলছ এত অস্থিরতার কিছু নাই। তোমরা কেউ-ই আমার ভালো চাও না।’

আমরা আবারও নিশ্চুপ। হঠাত্ আমার ছোট ভাই জুয়েল বলে উঠল, ‘চাচা, আপনি আপনার ভোটটা দিয়েছেন তো?’

চাচা এবার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। আমার ভোট! সত্যিই তো। আমার ভোটটাই তো দেয়া হয়নি। কথাগুলো বলেই চাচা চুপ করে রইলেন। এরপর আমাদের মাঝে একজন বলে উঠল, ‘চাচা, তাহলে পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টার কী হবে?’

চাচা কী যেন ভেবে বললেন, ‘অপরাধীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো।’

এরপর চাচা হনহন করে চলে গেলেন। আর আমরা সবাই হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেলাম।

আঁকা জ্যোতি