মো. খালেদুল ইসলাম খান
১.
জনতা ডেকোরেটর না-ও চিনতে পারে। তবে জাঙ্গিয়ার ডেকোরেটর বললে, জাঙ্গিয়া না পড়া ন্যাংটো পিচ্চি থেকে শুরু করে, বোরখা পড়া ভদ্রমহিলা পর্যন্ত সবাই আপনাকে জাহাঙ্গীর আলমের জনতা ডেকোরেটরটা দেখিয়ে দেবে। এত সুন্দর রাজকীয় নামটাকে মোরব্বা কেঁচা কেচে আন্ডারওয়ার বানানোর জন্য সুযোগ পেলেই গ্রামবাসীকে অভিশাপ দেয় জাহাঙ্গীর।
তবে গ্রামবাসীর কপাল ভালো। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে শাপশাপান্ত করার সুযোগ কমই পায় সে। তার যারা কট্টর সমালোচক, বিশেষ করে তার ব্যাপারে যারা ওয়াকিবহাল, তাদের মন্তব্য—‘জাঙ্গিয়া’ যার বন্ধু তার আর শত্রু লাগে না।
তারপরও এলাকাবাসীর ‘জাঙ্গিয়া’ ছাড়া চলে না। তা সে ধুতি-লুঙ্গিই পড়ুক কিংবা প্যান্ট-পায়জামা। বুদ্ধি-পরামর্শ নিতে সবাই ভিড় করে জাঙ্গিয়ার ডেকোরেটরে।
তরুণ-যুবক কাউকে নিজের জন্য হুমকি মনে করলেই জাঙ্গিয়ার পরামর্শে মুরব্বিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার শাদি-মোবারকের আয়োজন করতে। এ জন্য কোনো সার্ভিস চার্জ নেই তার। একদম ফ্রি। তবে ব্যবসা হাঁটতে হাঁটতেই ওর কোলে এসে পড়ে। প্যান্ডেল-প্লেট-গ্লাস তো ওর ডেকোরেটর থেকেই যাবে।
তবে হালের প্রজন্মের ওপর বেশ বিরক্ত সে। তাদের বিয়ের চেয়ে ইয়ের দিকে আগ্রহ বেশি। এইসব ডিজিটাল জেনারেশনের জন্য তার অব্যর্থ দাওয়াই, নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এই মহৌষধ খাওয়া বেশ কয়েকজনের দেখা মিলবে রাজধানীতে, নির্বাচনে হেরে আর সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে এখন রিকশা চালায়।
২.
সবাইকে বুদ্ধি দিয়ে দিয়ে এবার তার নিজেরই ভিমরতিতে ধরেছে। বাতাসে জোর গুজব, এবার নিজেই নির্বাচন করবে ‘জাঙ্গিয়া’।
‘বিষয়টা বুঝলাম না ভাই, সবাইরে বুদ্ধি বাতলে এখন নিজেই নির্বাচন করছেন?’
‘তাতে কী সমস্যা?’
‘ওরা তো কেউ পাস করতে পারে নাই।’
‘পাস করব কেমনে? ওরা তো পা ধরার কায়দাই জানে না। ঠিকমতো পা ধরতে পারলে বিজয় সুনিশ্চিত। দেখ না, পাঞ্জাবের লোকজন পা-রে কত সম্মান দেয়। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে চাচাজি, বাবাজি না বলে, সম্বোধন করে পাঁজি বলে।’
এবার বেকুব হওয়ার পালা আমার। জাঙ্গিয়ার ভাবনা-চিন্তা শুনে টাসকি খাওয়ার অবস্থা।
নির্বাচনে এলাকার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কুদরত মাস্টার। সবার কৌতূহল, কুদরতকে কীভাবে ম্যানেজ করবে সে। আর আমি কৌতূহলী, কুদরতের কুদরতি পা কীভাবে পাকড়াও করবে সে।
৩.
নির্বাচনের তফশিল ঘোষিত হয়েছে। আগামীকাল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। কুদরতকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরাতে হলে আজকের মধ্যেই একটা ফয়সালা করতে হবে। দুপুর পেরোতেই ঘনিষ্ঠ সহচরদের নিয়ে কুদরত মাস্টারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে ‘জাঙ্গিয়া’। এই সময়ে স্কুলের টিফিন পিরিয়ড। সুতরাং শিক্ষকদের কমনরুমে পাওয়া যাবে কুদরত মাস্টারকে। এতজন মান্যগণ্য শিক্ষকের সামনে কথা আদায় করতে পারলে, পরে আর কথা ফেলতে পারবে না কুদরত মাস্টার।
কৌতূহলে আমিও যোগ দিয়েছি। কিন্তু চ্যালাদের ভিড়ে আমার আর কমনরুমে ঢোকার উপায় নেই। অগত্যা দপ্তরির টুলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লাম ঘটনা দেখার জন্য।
শীতে সবসময় সোয়েটারই পরলেও আজ নেতাসুলভ ভাব নিয়ে বিশাল এক চাদর পরে এসেছে সে। বেশকিছুক্ষণ ভূমিকার পর আসল প্রসঙ্গ এল। হঠাত্ করে সামনের দিকে ঝুঁকল সে। একহাতে জড়িয়ে ধরল কুদরত মাস্টারের একটা হাত। চাদরটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
চমকে উঠল কুদরত। ‘কী করেন... কী করেন চাচা... আরে ছাড়েন ছাড়েন।’ অপ্রস্তুত হয়ে বলতে লাগল মাস্টার। ‘আপনে আমার বাবার চেয়েও বয়সে বড়। আপনে এইটা কী করেন?’
‘আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা, একবার জনপ্রতিনিধি হওয়া। কথা দাও, তুমি আমারে এইবার একটা সুযোগ দিবা।’
সামনের বিশাল ভিড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন ছাড়েন চাচা। এইবার আপনেই নির্বাচন করবেন। আমি আমার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিব।’
‘পাকা কথা দাও, নইলে তোমারে ছাড়ুম না।’
‘আমার জাঙ্গিয়ার কসম, এইবার আমারে ছাড়েন,’ বলল চরম বিব্রত কুদরত।
কুদরতের মতো বাঘা প্রতিযোগীকে কেবল হাতের ছোঁয়াতেই কুপোকাত হতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে জাঙ্গিয়ার অনুসারীরা। ঘোর কাটতেই সমস্বরে স্লোগান তুলল লোকজন; ‘আমার ভাই তোমার ভাই...’
কুদরতের হাত ছেড়ে দিল সে। মাটিতে লুটিয়ে পড়া চাদরটা টেনে নিল গায়ে। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় পরিষ্কার দেখলাম ব্যপারটা।
চাদর মাটিতে ফেলে আড়াল তৈরি করে এতক্ষণ একহাতে কুদরতের পা চেপে ধরে রেখেছিল সে।
সেবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল জাঙ্গিয়া।
সুলতানগঞ্জ, রায়েরবাজার, ঢাকা
