চতুর্থ পর্ব
উচ্চাঙ্গসংগীত, রাগসংগীত, শাস্ত্রীয়সংগীত বিভিন্ন নামে আমরা একটি সংগীতধারাকে বুঝে থাকি। এই সংগীতধারায় আমি শৈশব থেকে এত বেশি প্রভাবিত কেমন করে হয়েছি—তা আমি জানি না, ভেবেও পাই না। একদিকে উচ্চাঙ্গসংগীত অন্যদিকে রেডিও—এই দুটি বিষয়ই আমার জীবনে শুরু থেকে জড়িয়ে আছে।
অতি শৈশব থেকে দেখেছি আমাদের বাড়িতে একটি রেডিও, যেটা থেকে ভারতীয় আকাশবাণী নামে প্রচারিত রেডিও অনুষ্ঠান শুনতাম। প্রতি শনিবার রাতে সম্ভবত সাড়ে নয়টায় প্রচারিত হতো জাতীয় অনুষ্ঠান, যা আমার কাছে অতি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। এই অনুষ্ঠানে অবিভক্ত ভারতবর্ষের গুণী উচ্চাঙ্গসংগীত-শিল্পীদের রাগসংগীত প্রচার করা হতো। আমি আমার অজানা রাগ শিল্পী কিভাবে গাইছেন, কী স্বর কেমনভাবে ব্যবহার করছেন, রাগটিতে কোন স্বর ব্যবহার হয়, তা দ্রুত জানার জন্য, পণ্ডিত ভাতখণ্ডে, যিনি এই উপমহাদেশে রাগসংগীতের প্রাচীন রচনা বা বন্দেশ সংগ্রহ করে বই লিখে গেছেন, তাঁর সেই বইগুলি সঙ্গে নিয়ে ঐ অনুষ্ঠান শুনতাম, কারণ সব রাগ আমার জানা সম্ভব ছিল না। তবে ধ্রুপদ-খেয়ালের গায়নশৈলীর তফাত আমি আমার শ্রদ্ধেয় গুরুদের কাছে শিখেছিলাম। খেয়াল গানের ক্ষেত্রে কোন শিল্পী কী রাগ গাইছেন, কোন স্বর থেকে তা শুরু করছেন, বিলম্বিত বন্দেশ কী গাইছেন, কতক্ষণ গাইছেন, মধ্যলয়ের কোন বন্দেশ গাইছেন—সবই একটি খাতায় লিখে সেভাবেই সারা সপ্তাহ ঐ রাগটি আমি চর্চা করতাম। ধ্রুপদসংগীতের ক্ষেত্রে একইভাবে কোন শিল্পী কতক্ষণ আলাপ করছেন, কোন স্বর থেকে শুরু করছেন প্রভৃতি সবকিছুই আমি লিখে রাখতাম, অনুরূপভাবে আমি সারা সপ্তাহ তা অনুশীলন করতাম, একইভাবে গাওয়ার জন্য চেষ্টা করতাম, চর্চা করতাম। সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে না পারলে গুরুর কাছে এ বিষয়ে জেনে নিতাম। সেই দিক দিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় রেডিও আমার শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা ‘খ’ থেকে আমার বাংলা খেয়ালের অনুষ্ঠান ‘রাগ রং’ প্রতি শুক্রবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে প্রচার হয়। শৈশব থেকে আমার শিক্ষা, চর্চা, গুরুদের পরামর্শ সবকিছু মনে করে অনুষ্ঠানটিকে সাজাতে চেষ্টা করছি। শেখার আগ্রহ নিয়ে যদি অনুষ্ঠানটি শোনা যায় তবেই শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। আমি প্রতি মুহূর্ত চেষ্টা করছি উচ্চাঙ্গসংগীত বা রাগসংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য আমার সকল অনুষ্ঠান সহায়ক হোক, শুধু উচ্চাঙ্গসংগীত কেন, এ অঞ্চলে প্রচলিত সব ধরনের সংগীতের জন্য রাগসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীত শেখাটা জরুরি। কারণ আমাদের এই অঞ্চলে যেসব সংগীতধারা প্রচলিত তার সুর শুনলে বা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় সর্বক্ষেত্রেই আমাদের রাগসংগীতের প্রভাব রয়েছে। তাই রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীতসহ এক কথায় পঞ্চকবির গান এবং অন্যান্য গানের গায়নশৈলীর মাঝে রাগসংগীতের ছায়া রয়েছে, তাই রাগসংগীত চর্চা করলে তা যে কোনো গান গাওয়ার জন্য সহায়ক হবে।
আমাদের সময়ে শিশুদের লেখাপড়া শুরু হতো হাতেখড়ির মাধ্যমে। বেশ ঘটা করে আমারও হাতেখড়ি হয়েছিল। শিক্ষা অনুরাগী আমার বাবা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বেশ ধুমধাম করে আমার হাতেখড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষক, ছাত্র পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন কাপড়, জামা, জুতো নামি দোকান থেকে ক্রয় করা হয়েছিল। এছাড়া ছিল দই-মিষ্টি সহযোগে আপ্যায়ন, মিলাদের ব্যবস্থা ছিল। আমার শিক্ষার জন্য দোয়াদরুদ পড়া হয়েছিল। পঞ্জিকা দেখে সময় পর্যালোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ে হাতেখড়ির জন্য আদর্শ শিক্ষক শ্রী মুরারী গোস্বামীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই অনুষ্ঠানের জন্য শিক্ষককে উপহার দেওয়া ছাড়াও সম্মানী দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। শ্রী মুরারী গোস্বামী যিনি ছোটো একটি ধুতি পড়তেন, খালি গায়ে গলায় একটি পৈতে ঝুলত, মাথার পিছনের দিকে বিশাল টিকি, হাতে একটি ছড়ি, অতি শৈশবেই শনের কলম ধরে বানানো দোয়াতের কালি দিয়ে আমাকে অ লেখা শুরু করালেন। শিক্ষক যথারীতি তাঁর নিজ হিন্দুধর্ম মতে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। পাশে আমাদের মাওলানাও পবিত্র কোরআন পাঠ করলেন, এভাবেই শুরু হয়েছিল আমার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। আমাদের গ্রামের বাড়ির বৈঠকখানায় হয়েছিল এ অনুষ্ঠান। শিক্ষক নিয়মিত পাশের গ্রাম থেকে এসে সন্ধ্যায় আমাকে পড়িয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে আমার অমনোযোগিতার জন্য বাঁশের কঞ্চির ছড়ি দিয়ে হাত পাততে বলে পেটাতেন। আমি ছিলাম অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির।
গাছের সর্বোচ্চ ডালে উঠে আম পাড়তাম, গাছ থেকে পড়ে আছাড় খেতাম। হাত-পা কেটে যেত, ব্যথা পেতাম। পুকুরে মাছ ধরতাম। জ্বলে ডুবতে ডুবতে বেঁচে যেতাম, জোঁকে ধরত। সব থেকে বড়ো গোলমাল বাধাতাম, মাঠে যেসব মজুর লাঙ্গল বাইত, আমি আমার রোজার ঈদে, কোরবানির ঈদে পাওয়া সেলামির টাকা নানা, খালা, খালু, বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা পেতাম সেই টাকা তাঁদের দিয়ে লাঙ্গল ছেড়ে বসে থাকতে বলতাম। আমি লাঙ্গল বাইতে চেষ্টা করতাম। এর ফলে নানান ধরনের বিপদ ঘটত। মহিষের পায়ে ফাল ঢুকে যেত, মহিষ খোঁড়াত, পেয়ারাগাছে উঠে ডালের শীর্ষ স্থানে বসে বসে পেয়ারা খেতাম। এইসব দুরন্তপনার জন্য আমার বাবাও আমাকে ছড়ি দিয়ে মারতেন।
সেই সময়ে ছেলেদের বন্ধু পাতানো হতো, মেয়েদের সই পাতানো হতো। দুটি পরিবারের দুটি ছেলে কিংবা মেয়ে একরকম দেখতে হলে কখনো কখনো না হলেও গুরুজনরা মনে করলে এমনকি ভিন্ন সমপ্রদায়েরও হতে পারে, তাদের গুরুজনরা হয়তো যদি মনে করলেন তাদের দুজনের বন্ধু পাতাবেন। তখন ঘটা করে তাদের বন্ধু পাতানোর অনুষ্ঠান হতো। আমার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছিল, আমার বাবা-মা হিন্দু ব্রাহ্মণ সমপ্রদায়ের একটি ছেলে নিলু, নীলাম্বর মুখার্জীর সঙ্গে আমার বন্ধু পাতানো হলো। আমরা যেমন দুজন বন্ধু হয়ে গেলাম, সেইসঙ্গে দুই গ্রামের দুটি পরিবার ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। তাঁদের পুজোতে তাঁরা আমাদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন, আবার আমাদের ঈদ উত্সবে তাঁদেরকে আমরা পোলাওয়ের চাল, মাছ পাঠিয়ে দিতাম। নিলুর বাবা বর্ধমানে হাইস্কুলের হেডমাস্টার শ্রী গুরুদাস মুখার্জী, তাঁর বাড়িতে আমাকে রেখে দেওয়া হলো লেখাপড়ার জন্য। ক্লাশ ফোর থেকে ক্লাশ সেভেন পর্যন্ত তাঁর বাড়িতে থেকেই তাঁর তত্ত্বাবধানে আমি লেখাপড়া করেছি। পরে আমি মুসলমানপাড়ায় একটি মেসে উঠলেও তাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একইরকম ছিল। সেজন্য আমার কাছে হিন্দু মুসলমান কোনো ভিন্ন প্রাণী নয়, এক জাতি এক মানুষ। আমার বন্ধুর মা ‘বন্ধুমা’ অসাধারণ মহিলা ছিলেন, তখনকার দিনে হিন্দু পরিবারে মুরগির ডিমের নাম নেওয়া যেত না; কিন্তু তিনি মুরগির ডিম রান্না করে ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমাকে খাওয়াতেন। পরিবারের সবাই সপ্তাহে রুটিন করে রাতের খাওয়ার সময়ে কয়েক দিন ডিম, কয়েক দিন মাংস, সকালে প্রতিদিন মাছ এবং একদিন নিরামিশ খেতে হতো। তখনকার দিনে সকাল নয়টার সময় ভাত-মাছ খেয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যেত, বড়োরা যেতেন অফিসে। বন্ধুর দাদু শ্রীযুক্ত ভূধর মুখার্জী অসাধারণ একজন সংস্কারহীন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। দেখলে মনে হতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে দেখছি কি না? একেবারে সেই চেহারা, সেই দাড়ি, সেই চোখ-মুখ। আমি তাঁর কাছে গিয়ে মাঝে মাঝে পরামর্শ নিতাম তাও আমার বড়ো সম্পদ।
শৈশবে আমি বর্ধমানে ‘সংগীত সংসদ’ সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলাম। সংগীতশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল বর্ধমান মহারাজার রাজপ্রাসাদের পাশে রাজাদের একটি একতলা বাড়িতে। যে বাড়িতে পাশাপাশি কয়েকটি ঘর ছিল, এক একটি ঘরে কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, নৃত্যকলা বিষয়ে ক্লাশ হতো। প্রথম দিন থেকেই শিক্ষকদের স্নেহ-মমতার অংশীদার হয়ে গেলাম আমি। বিশেষভাবে শিক্ষকদের সন্তান তুল্য হয়ে মিলেমিশে গেলাম। এটা না হলে আমার আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব ছিল না। তাঁদের সংগীতবিদ্যা আমাকে উজাড় করে দেওয়ার মনোভাবে আমি ধন্য হয়েছি। বয়স্ক শিক্ষার্থীরাও আমাকে অতি আপনজনের মতো গ্রহণ করলেন। আমি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, তালবাদ্য, নৃত্যকলা সব বিষয়ের ক্লাশে আমি বসতে শুরু করে দিলাম। ওস্তাদ সাত্তার আলী খানের কাছে তবলা, পাখোয়াজের বোল শিখে অভ্যাস শুরু করলাম। নেপালদা তাঁর গানে আমাকে তবলা বাজানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন।
এই সবকিছুর মূল কারণ আমি যখন সংগীত সংসদে ভর্তি হওয়ার জন্য গেলাম, আমার পরীক্ষা নিলেন তিনজন শিক্ষক। শ্রীযুক্ত নেপাল আঢ্য আমাকে সারগম করতে বললেন সমান লয়ে, দ্বিগুণ, চতুর্গুণ, আটগুণ। আমি এত সাবলীলভাবে সুর-তাল ঠিক রেখে সবকিছু করলাম, তা দেখে তিনি বলে ফেললেন, ‘পিচ্চিটা তো দেখি ছোটো ওস্তাদ।’ সেই থেকে তিনি আমাকে অতি আপন করে নিলেন। সংগীত সংসদের বেতন ছিল পাঁচ টাকা। আমার যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য তাঁর ভাইজিকে প্রাইভেট পড়াতে বললেন। বেতন পাঁচ টাকা, তাতে আমার সংগীত সংসদের বেতন হয়ে যেত।
সেখানে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শ্রীযুক্ত নেপাল আঢ্য (কণ্ঠসংগীত), শ্রীযুক্ত শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য (যন্ত্রসংগীত), ওস্তাদ সাত্তার আলী খান (তবলা পাখোয়াজ)—এই তিন শিক্ষকের সকলেই ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী। শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপদ দাশ (কণ্ঠসংগীত), শ্রী বিন্দু বাবু (নৃত্যকলা) তাঁরাও ছিলেন সংগীত সংসদের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক।
বাঁকুরা বিষ্ণুপুর থেকেই এই অঞ্চলে বিশেষভাবে বাংলাভাষী অঞ্চলে উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রসার ঘটে। বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায় দীর্ঘদিন বর্ধমান মহারাজার সভাগায়ক ছিলেন। সেই সূত্রে রাজার রাজত্ব চলে যাওয়ার পরেও তিনি মাঝে মাঝে বর্ধমান আসতেন এবং বর্ধমানের সুচিকিত্সক শ্রী শৈলেন মুখার্জীর বাসায় অবস্থান করতেন। বর্ধমান এলেই আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব নেপাল আঢ্য, শ্রীযুক্ত শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য, ওস্তাদ সাত্তার আলী খান, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ‘সংগীত সংসদ’—সংগীত শিক্ষালয়ে আসতেন, গান শোনাতেন, কিছু বন্দেশ তুলে দিতেন। সেই সূত্রে আমি তাঁর কাছে বসে ধ্রুপদ শেখার সুযোগ পেয়েছি, যা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। শ্রীযুক্ত গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায় যখন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করতেন, আমি তাঁর সঙ্গে হারমোনিয়ামে সহযোগিতা করেছি, এ সবই আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের আমার প্রতি আস্থা এবং ভালোবাসার কারণে। সেই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রীর কাছে আমি অতি স্নেহের পাত্র হয়ে গেলাম। সেই সময়ে তাদের ছোটো দুটি কন্যা তাঁদের সঙ্গেই থাকতেন। পরবর্তী সময়ে শ্রীযুক্ত গোপেশ্বর বাবুর সুপুত্র শ্রী রমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কাছেও আমি ধ্রুপদ শিখেছি। বিষ্ণুপুর ঘরানার আর একজন গুণী শিক্ষক, শিল্পী শ্রীযুক্ত অমিয় রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের কাছেও খেয়াল শিখেছি। আমি দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে বিষ্ণুপুর ঘরানার নেপালদা, শিবুদা এবং ওস্তাদ সাত্তার আলী খানের কাছে তালিম নিয়েছি। সেই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে আমাকে বিষ্ণুপুর ঘরানার সংগীতশিল্পী বলা যায়। কিন্তু এটা দাবি করলে বিষ্ণুপুর ঘরানার জন্মসূত্রে বংশধররা আপত্তি করতে পারেন, তাঁরা তাঁদের মধ্যেই হয়তো ঘরানার সীমারেখা আবদ্ধ রাখতে চান। আমি অবশ্য শ্রীযুক্ত তারাপদ চক্রবর্তীর কাছে খেয়াল এবং অবিভক্ত ভারতবর্ষের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধ্রুপদী পণ্ডিত তানসেন পাণ্ডের কাছে ধ্রুপদ শিখেছি। শ্রীযুক্ত চিত্ত রায়ের কাছে নজরুলসংগীত, পুরাতন বাংলাগান, লোকসংগীত শিখেছি। শ্রীযুক্ত পরেশ মজুমদার, শ্রীযুক্ত পঞ্চানন ভট্টাচার্যের কাছে কীর্তন শিখেছি, শ্রীমতি মায়া সেনের কাছে শিখেছি রবীন্দ্রসংগীত, শ্রীযুক্ত সুবোধ নন্দীর কাছে তালবিদ্যা শিখেছি, শ্রীযুক্ত বীরেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস পড়াতেন, বহু গুণী ব্যক্তির কাছে আমি পিয়ানো শিখেছি। এসব কারণেই আমি সংগীতবিদ্যা কিছুটা হলেও আয়ত্ত করতে পেরেছি। আরো বহু জ্ঞানী-গুণী সংগীত শিক্ষকের কাছে আমার শেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার সেই গুরুদের নিয়ে আমি পরবর্তী সময়ে লিখব।
সেই সময়ে শিক্ষকদের আমরা নেপালদা, শিবুদা এবং ওস্তাদ সাত্তার আলী খানকে ওস্তাদজি বলতাম। ওস্তাদ সাত্তার আলী খান নেপালদা ও শিবুদারও ওস্তাদ ছিলেন, তিনি বিয়ে করেননি। তিনি যা রোজগার করতেন সবই আমাদের পিছনে ব্যয় করতেন। আমাদের আলুচপ, বেগুনি, মুড়ি খাইয়ে পাখোয়াজ নিয়ে বসতেন, ধ্রুপদ গাইতে বলতেন।
শিবুদা সেতার, এস্রাজ, তবলা ছাড়াও কণ্ঠসংগীতে পারদর্শী ছিলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বসে আলাপ দেখাতেন। এক সময় এমন হলো নেপালদাসহ সব শিক্ষক যেখানে শেখাতে যেতেন, সেখানে আমাকেও নিয়ে যেতেন। আমি যখন সেকেন্ড ইয়ারের শিক্ষার্থী, শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ারের ক্লাশ নিতাম। আমার থেকে বয়স্ক শিক্ষার্থীও আমাকে মেনে নিতেন। তাঁরা নিজেরাই অনেক সময় আমাকে টেনে নিয়ে ক্লাশে বসিয়ে গান শেখাতে বলতেন, তবলা সঙ্গত করতে বলতেন। সংগীতই হয়ে গেল আমার ধ্যানজ্ঞান। বেশ ঘটা করে ‘হলি উত্সব’ হতো। আমি হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হলি রং মাখতাম, গান গেয়ে বেড়াতাম। একদিন যে মুসলমানপাড়ায় আমি থাকি, সেখানে মেসের টিপকলে গোসল করছি, এমন সময় কয়েকজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যাই তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’ আমি বললাম হলি খেলতে। একজন বলল, ‘দেখেছেন কী বেয়াদব, কী করেছ, সেখানে গান গেয়েছ? কী গান গেয়েছ?’ আমি বললাম, রং মেখেছি, রং খেলেছি আর গান গেয়েছি। আবার বলল, ‘কী গান গেয়েছ?’ আমি বললাম, মনে রং দিতে পারো বসনেতে দিয়ো না। সে সবার প্রতি চেয়ে বলল, ‘দেখেছেন একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।’ আমার কিন্তু সে বয়সে মনে রং দিতে পারো বসনেতে দিয়ো না—এই গানের অর্থ বোঝা সম্ভব ছিল না। এ কথা বোঝানোর উপায়ও ছিল না।
সবার আলাপ-আলোচনায় আমার বাবা অতিষ্ঠ হয়ে আমাকে কলকাতায় তালতলার পীর সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন। সেই সময়ে ছিলেন দাদা হুজুর। দাদা হুজুর অত্যন্ত বয়স্ক, কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং, শান্ত সুপুরুষ, তিনি মসজিদে বসে ইবাদত করছিলেন, সম্ভবত তিনি বাংলা ভালো বোঝেন না—তাই আমার বাবা বললেন, হুজুর ‘হাম মর গেয়ে।’ হুজুর বললেন, ‘ক্যায়া হুয়া?’ আমার বাবা বললেন, ‘মেরা লাড়কা দিনরাত গানা গাতা হ্যায়।’ হুজুর আমাকে কাছে ডেকে কোলে নিয়ে দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিলেন, জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেটা গানা গাওগে।’ আমি বললাম, জি। তিনি আবার ফুঁ দিলেন মাথায়, আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেটা গানা শিখোগে?’ আমি বললাম, জি। তিনি আবার ফুঁ দিলেন মাথায়, আবার জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, জি। এইভাবে তিনবার বলার পর তিনি বললেন, ‘গানা শুনা সাকোগে?’ আমি বললাম, জি। তিনি বললেন, ‘শুনাও।’ আমি পুরিয়া রাগে প্রাচীন একটি বন্দেশ গাইতে শুরু করলাম।
আরজ শুন দস্তগীর পীর মোরি
আন পাড়ি মপে ভির পীর মোরি।
আমি গানেই বললাম, ‘পীর সাহেব আমার আবেদন শুনুন, আমার উপরে জুলুম হচ্ছে।’ গানটি শুনে হুজুর আমার মাথায় তিনবার ফুঁ দিলেন; আমার বাবাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘ইনকো কাভি গানা মাত্ ছুড়াইয়ে।’ আরো যা বললেন তার অর্থ হচ্ছে—সংগীত হচ্ছে একটি জাদুকরি ভাষা। সুর-তালের এই ভাষায় মানুষকে নির্মল আনন্দ দেওয়া যায়। তাই এ ভাষা চর্চা হওয়া প্রয়োজন, তবে সামাজিক শোভনতার সঙ্গে তা হতে হবে। আপনার ছেলের আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ গুণ রয়েছে, যা ঠিকমতো চর্চা করা দরকার। সারা ভারত এই ছেলের গুণের প্রশংসা করবে। হুজুরের এই কথায়, সেই থেকে আমার বাবা আমার সংগীত-শিক্ষা-সাধনার পক্ষে হয়ে গেলেন। আমিও এক মনে এক ধ্যানে এক লক্ষ্যে সংগীত নিয়ে আছি।
