মাইজভাণ্ডারীর জীবনদর্শন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ২০:৩৫

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ‘মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ’ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে একটি সুপরিচিত নাম। মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ মূলত তাওহিদের বাণী তথা ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রচারকেন্দ্র হিসেবে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ হলেন শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্্ মাইজভাণ্ডারী (ক.)। তার জন্ম পয়লা মাঘ ১২৩৩ বাংলা, ১৫ জানুয়ারি ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ বুধবার। ১৯০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ১০ মাঘ, ২৭ জিলকদ তারিখে তিনি ওফাত হন। আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও মর্যাদাসম্পন্ন হযরত শাহ্্ সুফি মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) গাউসে জামান হযরত শাহ্্ সুফি সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ সালেহ লাহোরীর (রহ) মুরাদপ্রাপ্ত হন। আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে মুর্শিদ কর্তৃক প্রকাশ্য আহ্বানে উপস্থিত হয়ে কামালিয়াতপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি মুরাদ হিসেবে সম্বোধিত হন। মুরাদপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কঠোর সাধনা শেষে মাইজভাণ্ডার গ্রামের নিজ গৃহে স্থায়ীভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সময় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য লোকসমাগমের কারণে মাইজভাণ্ডার গ্রাম ‘মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত অর্জন করে। মাইজভাণ্ডারিয়া ত্বরিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদানকারী দর্শনভিত্তিক গ্রন্থের নাম ‘বেলায়াতে মোত্্লাকা’। মহান করুণাময় স্রষ্টা আল্লাহ্্র সঙ্গে সংযোগ সম্পর্কিত প্রেমশক্তিতে বেগবান সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত প্রেমধারাকে বলা হয় ‘বেলায়াতে মোত্্লাকা’। বেলায়াতে মোত্্লাকা মূলত আল্লাহ্্র প্রতি আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য প্রকাশের ‘প্রেমজাত’ ধারণা সম্পর্কিত পন্থা। এ ধারণা অনুযায়ী বেলায়াতের ছায়া প্রাপ্তির বিষয়টি পৃথিবীবাসীর জন্য অবারিত ও উন্মুক্ত রাখা হয়। এক কথায়, আল্লাহ্্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের লক্ষ্যে এটি সব মানুষের জন্য উদার আহ্বানজনিত তাসাওউফ পন্থা। এটি নাস্তিক্যবাদী চিন্তার বিপরীতে বিশ্বব্যাপী ধর্মবিশ্বাসী আস্তিক্যবাদীদের জন্য ইতিবাচক দর্শন ও সহাবস্থানমূলক দিকনির্দেশনা।

গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তাসাউফের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করলে ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক উপাদান ‘স্বচ্ছ নৈতিক শক্তি’ (ইখলাস) অর্জনের পন্থা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তখন ইসলাম ধর্মে যান্ত্রিক কাঠামোভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব দৈহিক ও সামরিক তেজনির্ভরতা প্রাধান্যে চলে আসে। অথচ মানুষের মনে ইমানি তেজ প্রবল না থাকলে কাঠামো বা আনুষ্ঠানিকতা আচারসর্বস্বতায় রূপ নেয়। তাসাউফ তথা সুফিত্ব অর্জনের মাধ্যমে মানুষ তার ইমানি তেজকে দীপ্যমান রাখতে সক্ষম হয়ে থাকে। তাওহিদের বাণী প্রচারপন্থার দর্শনভিত্তিক গ্রন্থ বেলায়াতে মোত্্লাকায় বর্ণিত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) অভিধাসমূহ হচ্ছে (১) খাতেমুল অলদ, (২) ফরদুল আফরাদ এবং (৩) জামে উত্্তনজিহ্ ওয়াত্তশবীহ্্। ‘গাউসুল আযম’ লকব তার আধ্যাত্মিক পদমর্যাদাগত সোপান এবং বেলায়াতি শান। বেলায়াতে মোত্্লাকা গ্রন্থে বিশ্বমানবের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিমিত্তে (ক) মানব সাম্য, (খ) বিচার সাম্য এবং (গ) ধর্মীয় সহাবস্থানের বিষয়ে পবিত্র কুরআনভিত্তিক সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী মানব জাতির সহাবস্থানের জন্য মহানবী (দ.) প্রবর্তিত মদিনা সনদকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ বহু ধর্ম, বহু জনগোষ্ঠী, বহু সম্প্রদায়, বহু বর্ণের মানব সমাজে  (PLURALIST SOCIETY) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে ‘মদিনা সনদ’ হচ্ছে সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক দলিল। গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) তার তাসাউফপন্থা, পবিত্র বাক্য ও কার্যকলাপের মাধ্যমে এ ধরনের মানবকল্যাণ ও সংহতিমুখী সর্বজনীন সমাজকাঠামোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।

লেখক :সুফিতত্ত্ববিদ