ঘরে ফেরার মেহনত

দাওয়াতে তাবলিগ কী এবং কেন?

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ২০:৩৬

দাওয়াত শব্দটি আল-কোরআনে উল্লিখিত রয়েছে বিধায় শব্দটি আল্লাহ্ তায়ালার নিজস্ব ভাষা, তাই দাওয়াত শব্দটি আল্লাহ্ তায়ালার বিধানের দিকে ডাকার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। যুগে যুগে যখন মানুষ আল্লাহ্ ও তার বিধান ভুলে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে, তখনই আল্লাহ্পাক মেহেরবানি করে মানব জাতির মধ্যে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবি বা রাসুল পাঠিয়েছেন। আর সব নবি-রাসুলই তার কওম বা জাতির কাছে প্রথমেই তার আপন প্রভু তথা বিশ্ব পালনকর্তার দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। কেননা, আল্লাহ্পাক নিজেই বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম আর কার কথা হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহ্র পথে ডাকে এবং নেক আমল করে এবং বলে যে নিশ্চয় আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন।’ (সুরা হা-মিম সিজদা রুকু-৫)।

আল্লাহ্পাক স্বয়ং নিজেই দাওয়াত দিচ্ছেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো, অর্থাত্ পুরোপুরি দিনদার হও (সুরা বাকারা-২০৮)।’ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্তায়ালা তার রাসুলকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথের দিকে দাওয়াত দাও জ্ঞানগর্ভ কথা এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল)। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তায়ালা আরো বলেন, ‘বলে দাও, আমার পথ তো এটাই, আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসারী তারাও (আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দেয়)।’- (সুরা ইউসুফ)। সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ওফাতের পর কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবি আসবেন না। কিন্তু তার প্রকৃত অনুসারীরাই কোরআন ও সুন্নাহ্র ভিত্তিতে মানুষকে আল্লাহ্র প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য দাওয়াতের কাজটি চালিয়ে যাবেন। দাওয়াত বা আহ্বানের কাজটি কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকবে। কোরআন-হাদিসে দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। ‘এবং তোমাদের মধ্যে এমন একটা জামায়াত থাকা উচিত, যারা মঙ্গলের দিকে আহ্বান করবে। অর্থাত্ সত্ কাজের আদেশ ও অসত্ কাজের নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম জামায়াত’। (আল ইমরান ১০৪-১০৫)। এ দাওয়াত নিজের সংশোধন তথা সমগ্র মানব জাতির মুক্তির দাওয়াত। সুতরাং মানবজীবনে এ দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

দাওয়াতের কাজ না করলে এর অশুভ পরিণাম সম্পর্কে হাদিসে পাকে সতর্কবাণী এসেছে। “হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একদিন হুজুর (স) আমার ঘরে তাশরিফ আনলেন। আমি হুজুরের চেহারা মুবারকের প্রতি লক্ষ করে অনুভব করলাম, নিশ্চয় একটা কিছু ঘটেছে। হুজুর (স) কারো সঙ্গে কথাবার্তা না বলে মসজিদে তাশরিফ নিয়ে গেলেন। আমি হুজুর (স)-এর এরশাদ শোনার জন্য হুজরার দেওয়ালে টেক লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। হুজুর (স) মিম্বারে উঠে প্রথমে আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন এবং পরে এরশাদ করলেন, ‘হে লোক সকল। আল্লাহ্পাক বলেন, তোমরা সত্কাজের আদেশ ও অসত্ কাজের নিষেধ করতে থাকো। হয়তো এমন সময় এসে পড়বে, তোমরা দোয়া করবে আমি তা কবুল করব না, তোমরা ছওয়াল করবে কিন্তু আমি তা পূর্ণ করব না, আর তোমরা শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করবে কিন্তু আমি সাহায্য করব না।’ এ পর্যন্ত বলেই তিনি মিম্বার থেকে নেমে এলেন।” অতএব, আজ অন্যায়-অত্যাচার-অবিচার, শির্ক-বিদ্য়াত ও অপসংস্কৃতির মহাপাপে নিপতিত মানব জাতিকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য উম্মাতে মোহাম্মাদিকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র আল্লাহ্ও তার রাসুলের সন্তোষ্টি বিধানের জন্য স্রেফ নিজস্ব টাকাপয়সা খরচ করে ‘শিখন ও শিখানো’ অর্থাত্ নিজে জ্ঞানী, গুণী ও কর্মঠ হওয়া এবং অপরকে এ কাজে উত্সাহিত করার এই যুগপত মেহনত কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখতেই হবে। কেননা, তাবলিগ করার জন্য রাসুলুল্লাহ (স)কে আল্লাহ্পাক নির্দেশনা দিচ্ছেন, ‘হে নবি (স) আপনার মহান প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার নিকট যা অবতীর্ণ করা হয়ছে, তা আমার বান্দাদের কাছে পৌঁছাতে থাকুন। যদি একটা কথাও তাবলিগ করা থেকে বাকি থাকে, তাহলে আপনার রিসালাতের দায়িত্ব অসমাপ্ত থেকে যাবে।’ (সুরা মায়েদা-৬৭)। আল্লাহ্পাক আরো বলেন, ‘হে বস্ত্রাচ্ছাদিত কম্বলওয়ালা, উঠুন আর সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন (সুরা মোদাচ্ছের)।’ বিদায় ভাষণে রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘আমার থেকে প্রাপ্ত দিনের বিষয়গুলো তোমরা এখানে অনুপস্থিতদের কাছে তাবলিগের মাধ্যমে পৌঁছে দাও।’

দাওয়াতি কাজ বলতে সংক্ষেপে ‘আমের বিল মা’রুফ এবং নিহি আনিল মুন্কারকে’ বোঝায়। অর্থাত্, সত্কাজের আদেশ ও অসত্ কাজে নিষেধ। এ কাজ না করলে তার ক্ষতির দিক সম্পর্কে আল্লাহ্পাক বলেন, ‘জামানার কছম, সমস্ত মানুষই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। একমাত্র ঐ সব লোক ক্ষতির মধ্যে নহে, যারা ইমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে আর একে অপরকে সত্পথে চলার উপদেশ দিয়েছে এবং মুছিবতের সময় ছবর করার তাগিদ দিয়েছে।’ (সুরা আসর)।

 লেখক :শিক্ষক (অব) বছিউড়া দারুল উলুম ইসলামিয়া আকবরিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং সাবেক বার্তা ও সহকারী মস্পাদক, সাপ্তাহিক তিতাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া