হিরু তবে হেরে গেল!

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৩৫

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

‘কাউকে বাঁশ দিতে চাইলে প্রথম তরিকা হলো তার প্রশংসা করো। প্রশংসা করলে তার বুকের ছাতি কমসে কম তিন ইঞ্চি ফুলে উঠবে। সে আগের থেকে ভুল করবে বেশি। এরপরে বাকি সর্বনাশ করতে চাইলে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দাও। তাতে যা হবে...। আশা করি এতে চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটতে আর বাকি থাকবে না। তারপরেও যতি সৌভাগ্যক্রমে কারোর সর্বনাশের ষোলো কলা পূর্ণ না হয়, তো তাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দাও।’

হিরু এই পর্যন্ত বলে থামল।

অন্যরা ততক্ষণে অস্থির।

‘এ তুমি কী বলছ হিরু ভাই। তোমাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে বলছি বলে তুমি এভাবে বলতে পারলে?’ যেন অভিমানে গাল ফুলে উঠেছে একেকজনের।

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘এগুলো সেই প্রাচীনআমল থেকেই চলে আসছে রে। যুগ পাল্টাচ্ছে। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। কিন্তু কাউকে বাঁশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো এই আদি ও অকৃত্রিম তরিকাই কার্যকর, অব্যর্থ। এর কোনো বিকল্প-টল্পও নাই।’

‘তাহলে তুমি ভাবছ আমরা তোমাকে বাঁশ দিতেই নির্বাচনে দাঁড়াতে বলছি?’

‘সে কথা কখন বললাম।’

‘বলতে আর বাকি রাখলে কী!’

‘সে বাদ দে। এখন তোরা কী চাস তাই বল, শুনি।’

‘আমরা তোমাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই।’

‘এ তো ওয়ান-টুর ব্যাপার। একটা মনোনয়ন পত্র কিনলেই হয়ে গেলাম মেয়র প্রার্থী।’

‘শুধু মেয়র প্রার্থীই না। আমরা তোমাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই।’

‘তো আমাকে এখন কী করতে হবে?’

‘তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। তুমি শুধু রাজি হলেই হবে।’

‘আচ্ছা, হলাম রাজি। তা জামানতের টাকাটা তাহলে তোরাই দিচ্ছিস?’

‘ইয়ে মানে হ্যাঁ...’ ঢোঁক গিলে বলল সকলে।

‘আর প্রচার প্রচারণার ব্যাপারটা?’

‘বাকি সব আমাদের ওপরে ছেড়ে দাও তো।’

‘দিলাম ছেড়ে। এখন তাহলে আমি যাই। তোরা চায়ের বিলটা ভাগ-যোগ করে দিয়ে দিস।’

হিরু উঠে চলে গেল। অন্যরা ততক্ষণে থ।

কেউ নির্বাচনে দাঁড়া হলে দেদারসে চা খাওয়ায়। এ যুগে কেবল চাতেই হয় না, টাও লাগে। আর হিরু কিনা শুরুতেই চায়ের বিল না দিয়ে উঠে চলে গেল!

 

দুই.

হিরুকে নির্বাচনে দাঁড়া করাতে পেরে এই দলের কয়েকজন যারপরনাই খুশি। ‘যাক, সবচে মোটা দেখে বাঁশটা তৈরি করা হলো। হিরু এবার নিজে থেকেই সেই বাঁশের দিকে এগিয়ে আসছে।’

‘কিন্তু...’ মনের মধ্যে খচখচানি শুরু হয়েছে তাদের। ‘হিরুকে বাঁশ দেওয়া কি এতই সহজ? সবসময় ওঁতে ওঁতে থাকতে হবে।’ চূড়ন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তারা।

আসল ঘটনা হলো হিরুর শত শত শুভাকাঙ্ক্ষী থাকলেও কেউ কেউ যে তার ক্ষতি করতে চায় না, এমন কিন্তু নয়। এদের সঙ্গে হিরুর যেচে শত্রুতামি করতে হয়নি। আপনাআপনিই হয়ে গেছে। তারা এখন হিরুর যেকোনো উন্নতিতেই হিংসা করে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা হিরুকে বাঁশ দিতে চেষ্টা করেছে। তারপর হিরু যখন বিয়ে করবে না বলে গড়িমসি করছে, তখন রুহির সঙ্গে হিরুর বিয়েটা ত্বরান্বিত করার সব রকমের জোগাড়-যন্ত্র তারাই করেছিল। ভেবেছিল, এই যাত্রায় হিরুটা শেষ। আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু বিবাহিত জীবন সম্পর্কে নিউটনের প্রথম সূত্রকে ভুল প্রমাণিত করে হিরুকে আগের চেয়ে ডাবল সুখী থাকতে দেখে শেষে তাদের যা অবস্থাই না হলো! শেষমেশ তারা কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকল। হিরুর নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য সম্মতি প্রকাশ মানে এই তির আর ব্যর্থ হচ্ছে না। জায়গামতো গিয়েই বিঁধবে।

‘কিন্তু...’ আবারও তাদের মনের মধ্যে খচখচানি শুরু হয়েছে। একটু আগে হিরু যা বলে গেল, সেগুলো কি তাদেরকে মিন করেই বলেছে? হিরু তো সবই বোঝে। তবে কেন নিজে থেকে বাঁশ খেতে চাইছে?’

হিসাব মিলছে না তাদের।

 

তিন.

নির্বাচনের প্রচারণার সময় নিজ এলাকায় হিরুকে দেখা গেল না। সকলের মনে চাপা গুঞ্জন, হিরু কি তবে মনোনয়নপত্র কিনেনি? নাকি আগেই হেরে যাওয়ার ভয়ে পালিয়েছে?

দুদিন পরে অবশ্য তাদের সেই আশঙ্কাও তাদের দূর হলো। হিরুর নামে একটি নয়, দুটি মনোনয়নপত্র কেনা হয়েছে! একটি কিনেছে হিরুর খাস চ্যালারা, হিরুর অনুমতি নিয়েই। আরেকটি কিনেছে তার অতি উত্সাহী চ্যালারা, যারা শিওর হতে চায়, হিরু এবার নিশ্চিতভাবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বাঁশ খেতে চলেছে।

দুদিন পরে দেখা  গেল, হিরুর প্রথম মনোনয়নপত্রটি কিছু ভুল থাকায় বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু দ্বিতীয় মনোনয়নপত্রে কোনো ভুল না থাকায় সেটিই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। হিরুকে বাঁশ দিতে চলা লোকগুলো তাদের পেশাদারিত্বের জায়গায় খামতি রাখেনি।

সকলের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল, হিরুকে মানুষ কত কত ভাবেই না ভালোবাসে!

 

সে নাহয় ছড়াল। কিন্তু আসল ঘটনা হলো—হিরু কই?

পরে দেখা গেল, হিরু তাদের আশপাশেই আছে। নিজের নির্বাচনী এলাকা ভেবে পাশের আসনগুলোতে নিজের প্রচারণা চালাচ্ছে।

কয়েকজন হিরুকে সাবধান করতে গিয়ে উল্টো বকা খেয়ে ফিরে এলো, ‘আরে ব্যাটা, বেশি বুঝস? এটাই তো আমার নির্বাচনী এলাকা। আমি আমার নির্বাচনী এলাকা চিনি না?’

অন্যরা আর হিরুর ভুল ভাঙাতে গেল না। ‘যাক না ব্যাটা অন্য এলাকায়, বাঁশ তো রেডি’।

 

চার.

এলাকার চায়ের দোকানগুলোতে রেড অ্যালার্ট। হিরুর নামে কোনো বাকি দেওয়া চলবে না। কেউ যদি দেয়ও, সে যেন পরবর্তীকালে সেই টাকার মায়া না করে।

কয়েকজন গেল এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে। হিরুকে অত্র এলাকার কে না চেনে? সুতরাং কোনো এক জায়গা থেকে নিশ্চিতভাবেই হিরুর নাম ভাঙিয়ে খেয়ে আসা যাবে।

কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। কোথাও হিরুর নামে বাকি মিলছে না। ভোটাররা হতাশ, খেতে না পেরে। দোকানদাররাও হতাশ, হিরুর নামে খাইয়ে টু-পাইস ইনকাম না করতে পেরে।

তবে, হিরুদের বাসার সামনের উঠোনে গুড়ের চা একদম ফ্রিতে বিলি হচ্ছে। বাধ্যহয়ে সেই চা খেতেই প্রথম একজন দুজন গেল। পরে দেখা গেল, এলাকার কোনো চায়ের দোকানেই আর চা বিক্রি হয় না। সবাই হিরুদের বাসায় এসে চা গিলছে।

দুদিন পর দেখা গেল, হিরুদের বাসার পেছনের বিশাল দিঘিটা পানিশূন্য হয়ে গেছে। বহু বছর ধরে পুকুরটা সংস্কার করব করব করেও করা হয়নি। মাছগুলো বড়ো হয়ে হয়ে কতটা বিশাল হয়েছে কে জানে। কিন্তু এত বিশাল দিঘি পাম্প চালিয়ে পানিশূন্য করতেও তো ম্যালা খরচার ব্যাপার, সেই ভয়ে আর এগোয়নি ওরা। অবশেষে, পাবলিককে সেই পুকুরের পানি দিয়ে চা খাওয়ানোর সঙ্গে পুকুরটা সেচা গেছে!

পাবলিক অবশ্য এতকিছু বুঝতে পারল না।

 

পাঁচ.

কয়েকদিন পরে এলাকার মানুষজন ভিন্ন একটা কারণে দলে দলে টাশকি খেতে লাগল। তাদের আসনের পাশে যে কয়টা আসন রয়েছে, সেগুলোতে তাদের যে আত্মীয়-স্বজনরা থাকে, তাদের মুখে মুখে হিরুর জয়গান। তারা ফোন দিয়ে হিরুর জন্য ভোট চাইছে!

‘ঘটনা কী?’

এই ভাবনাতে কয়েকজনের নাওয়া-খাওয়া হারাম। শেষমেশ জানা গেল, হিরু ঐ এলাকাগুলোতে গিয়ে জনগণের সাথে মিশে গেছে। ঐসব এলাকার বিভিন্ন দলের প্রচার সেলের সঙ্গে কাজ করেছে সে। প্রথমে গেছে ‘এ’ দলের হয়ে, তারপর গেছে ‘বি’ দলের কর্মী হয়ে, তারপর গেছে ‘সি’-এর সদস্য হয়ে।

এ, বি, সি প্রতিটি দলের জন্য ভোট চেয়েছে সে। বলেছে, ‘এদের মধ্য থেকে আপনাদের যাকে বেশি যোগ্য মনে হয়, তাকেই ভোটটা দিয়েন।’

পাবলিক তখন নিজে থেকেই জানতে চেয়েছে, ‘আপনার মতো এমন প্রচারণা তো কেউ করেনি কখনো। আপনার মতে কে বেশি যোগ্য?’

‘সে আমি কীভাবে বলি বলুন।’ হিরু তখন বিনয়ের অবতার। ‘আমি আপনাদের পাশের আসন চ্যালাপুরের মেয়র প্রার্থী। কিন্তু, আমি কেবল নিজেকে চ্যালাপুরের সন্তান বলেই মনে করি না। আমি আপনাদেরও সন্তান।’

পাবলিক অবাক! চ্যালাপুরের মেয়রপ্রার্থী এসেছে তাদের এলাকার খোঁজখবর নিতে! তাদের এলাকার ভালো চাইতে! এমন প্রার্থীই তো প্রতিটি আসনে দরকার। সে কারণেই তারা নিজ দায়িত্বে চ্যালাপুরে বসবাসরত তাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফোন দিয়ে হিরুর গুণগান গেয়েছে। হিরুকে ভোট দিতে উত্সাহিত করেছে।

 

ছয়.

বিষয়টা যে হিরুর পক্ষে গেছে, তা কিন্তু নয়, হিরুকে বাঁশ দিতে না পেরে একাট্টা হলো অনেকেই। অনেকে ভেবে বসল, হিরুর জনপ্রিয়তা এতে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু কিছুতেই তার মেয়র হওয়া চলবে না। তাকে বাঁশ দিতে হবে।

হিরুর বাসায় গিয়ে দেদারসে চা গেলা পাবলিকরা ভাবল, হিরু কেন কেবল নির্বাচনের আগে এমন স্পেশাল গুড়ের চা খাওয়াবে। পরেও খাওয়াবে। কিন্তু মেয়র হলে পরে তো তাকে পাওয়া যাবে না। তাকে পাওয়া না গেলে চাও মিলবে না। সুতরাং তার নির্বাচিত হওয়া চলবে না। তাকে নির্বাচনে বাঁশ দিতেই হবে।

আর যারা হিরুর নামে কোথাও বাকি খেতে পারেনি, তারা তো আগে থেকেই খেপে বোম হয়ে আছে। গুদাম থেকে বাঁশ এখন তাদের হাতে।

হিরুর সুহূদরা শঙ্কিত। হিরু কি তবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভুল করল! হিরু তবে হেরেই গেল!

 

দুদিন পরে এলাকায় পোস্টার দেখে সকলেই তব্দা খেল। হিরুর পোস্টার। সকলে আবিষ্কার করল, এবার নির্বাচনে হিরুর মার্কা—বাঁশ মার্কা।

নির্বাচনের দিন পাবলিক তাকে ‘বাঁশ’ না দিয়ে যাবে কই?    g