/ খালিদ ফেরদৌস
বিশ্বাস করুন আর অবিশ্বাস না করুন, পৃথিবীর কোনো জিনিস বা পদার্থের নিজস্ব রং বা কালার নেই। পানি ও মেয়েলি স্বভাবের ছেলেরা (মেয়েরা তো বটেই) যখন যে পাত্রে যায়, সেই পাত্রের আকার ধারণ করে; তেমনি পদার্থ যে আলোতে ডুবানো হয়, সেই আলো অনুযায়ী রং ধারণ করে। মজার বিষয় মানুষ কালারের বিচিত্র ব্যবহার ও অপব্যবহার করে থাকে। যেমন—
সাহিত্য-সিনেমা-নাটক-বিজ্ঞাপন রং :এগুলোতে বলা হয়, রঙের মানুষ (একাধিক ছেলে-মেয়ের সঙ্গে প্রেম করলে), মনে কোনো রং নেই (পড়া শেষ করে চাকরি না পেলে), আজ আকাশের অনেক রং (পরীক্ষার কারণে বাইরে বের হতে না পারলে), আজ আকাশের কোনো রং নেই (পরীক্ষা শেষ হলে অনেক কিছু করব; কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলে কিছুই করতে মন না চাইলে), বিজ্ঞাপনে দেখ দেখ রঙেরই বাহার (যখন সামনে পরীক্ষা চলে আসে, তখন বিটিভির সংবাদ ও বিজ্ঞাপন দেখতেও ভালো লাগে)।
কিন্তু রঙের মানুষ হয় না। বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষ হয়। মন সব সময় কোনো না কোনো রঙে রঙিন থাকে। মূলত মন থাকে অন্ধকারে। হূদপিণ্ড আলোতে আনলে আলো অনুযায়ী কখনো রক্তাক্ত (সিগারেট পানে বা ছ্যাঁকা খেলে) কখনো নীলাভ (পচা মাছ কিনে বউয়ের কাছে বকা খেলে)। আকাশের কোনো না কোনো রং থাকতেই হবে। যেমন :সুনীল (প্রিয়জনের হাতধরে কাশবনে বসে থাকলে), আকাশী (প্রিয়জন উড়ে গেলে), ধূসর (বাবা-মা গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি না হলে), বিজ্ঞাপনের একটাই রং; নাম তার প্রচার।
ভালোবাসার রং :ভালোবাসা নিয়ে অতি ভাঁড়ামো করে বলা হয়, হালকা পিঙ্ক কালারের ভালোবাসা। চিনিগুঁড়া প্রেম। ওগো শুনছ? এবার বার্থ ডেতে আমাকে বেবি পিঙ্ক কালারের ড্রেস দেবে। ভালোবাসার কোনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যময় রং থাকে না। ভালোবাসার রং দুটি—বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা।
কালার টিভি :সাদা-কালো টিভির পর যখন রঙিন টিভি এলো, তখন মানুষ আদর করে তার নাম দিল কালার টিভি। আচ্ছা বলুন তো, সাদা-কালো কী কোনো রং না। অবশ্যই রং। এটা সাদা ও কালো রং।
চায়ের রং :চা এদেশে ব্রিটিশরা চালু করলেও বাঙালিদের প্রাত্যহিক জীবনে এটা অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। আমরা চায়ের দোকানে গিয়ে বলি, চিনি বেশি বা হালকা চিনি দিয়ে এক কাপ লাল চা দেন বা রং চা দেন। কিন্তু চায়ের রং চা পাতার মতো। কেউ কী কখনো দেখেছেন চায়ের রং রক্তের মতো লাল? আবার রং চা বলতে আমরা লিকার চাকে বুঝি। লিকার চায়ের রং চায়ের মতো। তাহলে দুধ চা, কফি চা বা অন্য চায়ের কী কোনো রং নেই। অবশ্যই আছে। দুধ চায়ের এক রং, কফি চা বা সাত রঙের চায়ের সাত রং।
সাদা পোশাকের পুলিশ :দেশে নিরাপত্তা জোরদারের কোনো প্রসঙ্গ এলে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক মিডিয়াগুলোতে বলা হয়, তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তার চাদরে মোড়া থাকবে সারা শহর। পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আপনারা কোনো দিন সাদা পোশাকের পুলিশ দেখেছেন? দেখেননি। আসলে তারা সিভিল পোশাকে থাকে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গে অবশ্য সাদা পোশাকের পুলিশ আছে।
চকলেট কালার :একসময় চকলেটের একটা নির্দিষ্ট কালার ছিল। যেমন চকলেট কালারের জুতা, ব্যাগ। এখন নানারঙের টেক্সটাইল কালারে সয়লাব হয়ে যাওয়াতে চকলেট কালার নিজস্বতা হারিয়েছে।
বিস্কুট কালার :অতীতে চকলেটের মতো বিস্কুটেরও নির্দিষ্ট একটা রং ছিল। তাই কোনো জিনিসের কালার বোঝাতে বলা হতো বিস্কুট কালার। যেমন বিস্কুট কালারের থ্রি-পিস, ক্যাপ। কিন্তু এখন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বাহারি কালারের বিস্কুট বের হওয়াতে বিস্কুটের নিজস্ব কালার হুমকির মুখে পড়েছে।
পেস্ট কালার :আগে পেস্টের কালার ফিরোজা কালারের হতো। যেমন পেস্ট কালারের সালোয়ার-কামিজ। এখন নানা কেমিক্যালের নানা কালারের পেস্ট তৈরি হয়। যার দরুণ পেস্ট কালার বলতে এখন ফিরোজা কারারকে বোঝানো মুশকিল ব্যাপার।
লোক কালার :মানুষ কোনো খারাপ কাজ করলে বলে, লোকটার একটা ভালো ইমেজ বা মারমূর্তি ছিল। কিন্তু লোকটি একটা খারাপ কাজ করেই সবার কাছে কালার হয়ে গেছে। আসলেই কী সে কালার হয়ে যায়। সে সবার কাছে মন্দ বলে প্রমাণিত হয়।
শিক্ষক রং :এখনকার শিক্ষকরাও নাকি সাদা, নীল, বেগুনি, গোলাপি রঙের হয়। কোনো দিন কেউ কী দেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য ক্যাম্পাসে লাল, সাদা বা অন্য কোনো কালারের শিক্ষককে ঘুরে বেড়াতে? আসলে তাদের ব্যক্তি স্বার্থ চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে এক এক দলের শিক্ষক এক এক রঙে বিভক্ত হয়ে রাজনীতি করে।
কষ্ট রং :কবিতায় আছে, কষ্ট নেবে কষ্ট? রকমারি রোমান্টিক কষ্ট আছে। হলুদ খামের চিঠির কষ্ট, মেসেজের কষ্ট, ফেসবুক কষ্ট, ইনস্টাগ্রাম কষ্ট, মালটি প্রেমের গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড কষ্ট। কিন্তু কষ্টের একটাই রং—মানসিক যন্ত্রণা (যখন তোমাকে না দেখলে একদিন, বুকের ভেতরে করে চিন চিন চিন; অবশ্যই জাপান জাপান নয়)।
মানুষের আসল রং :মানুষের ভেতরে শরীরের বর্ণ, চেতনা, দর্শন, বিশ্বাস, ধর্মসহ বিভিন্ন কারণে নানা রঙের হয়। তবে পৃথিবীতে মানুষসহ কোনো জিনিস বা পদার্থের কোনো রং নেই। সূর্যের আলো যদি সোনালি না হয়ে নীল হতো তাহলে নিমিষেই সব রং অন্য রং ধারণ করত। অর্থাত্ কোনো জিনিসের উপর কোন রং পড়ছে তার ওপর ভিত্তি করে তার রং ফুটে ওঠে। মানুষের মধ্যে যদি সততা, মানব হিতৈষী দর্শন ও ধর্মীয় বিশ্বাস থাকত তবে সবার একটায় রং হতো; আর সেটা হতো মানুষ রং।
প্রভাষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ।
