সমাধির ব্যাপারে বাবা আমাকে বলে গিয়েছিলেন, আমাদের পরিবারের সদস্যদের যেখানে সমাহিত করা হয়, বিশেষ করে আমার দাদা-দাদির পাশে যেন বাবাকে সমাহিত করা হয়। এটা বাবার শেষ ইচ্ছে ছিল। বাবার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে আমাদের দাদা-দাদির কবরের পাশেই আজ সমাহিত করা হবে। কবরস্থানটা জামালপুরে। এটা বেশ বড় কবরস্থান।
বাবার আরেকটা ইচ্ছে ছিল জামালপুরের বাড়িটাকে একটু সুন্দর করে সাজানো। বাবা একটি রেকডিংয়ে বলেছিলেন, ‘আমি মারা যাওয়ার পরও মানুষ আমার খোঁজে জামালপুর যাবে। তারা বসে যেন কথা বলতে পারে, জল-খাবার খেতে পারে, সেহেতু আমি চাই বাড়িটাকে একটু গোছাতে।’
এখন যে বাড়িটা আছে, ওটা বাবারই করা। আমরা বাবার কথামতো বাড়ির বাকি কাজগুলো শেষ করবো।
আমার বাবা সবসময় বলতেন, ‘আমি প্রথম পপুলার হই জামালপুর শহরে। যখন আমার ছড়া বের হতো, জামালপুরবাসী সেগুলো পড়তো। তখন থেকে মানুষ আমাকে চিনতো লেখক আমজাদ হোসেন হিসেবে। ওদের ভালোবাসা কখনো ভোলার নয়। ওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আড্ডা দিয়ে, খাওয়া-দাওয়া করে আমি বড় হয়েছি। ঢাকা শহরের মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। শহরের মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর, খবরই নেয় না কারো। কিন্তু আমি জানি জামালপুরের মানুষরা আমাকে কখনো ভুলবে না। আমি মারা গেলে তারা অনেক কষ্ট পাবে, অনেক ভিড় হবে। আমি জানি।’
শহরের মানুষকে আমার বাবা বিশ্বাস করতেন না শুধু একটা কারণেই। শামসুর রহমান থেকে শুরু করে অনেক বিখ্যাত মানুষের কবর এই ঢাকাতেই। কিন্তু তাদের খোঁজ ক’জন নেয়? প্রতিবছর ক’বার যাওয়া হয় তাদের কবরের পাশে? তাদের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীতে ছোটখাটো একটি অনুষ্ঠান করে আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলি! অথচ এই মানুষগুলো আমাদের কতকিছুই না দিয়ে গেল!
বাবা বলতেন, ‘যদি ধর্মীয় দিক দিয়েও চিন্তা করি তাহলে দেখা যায় শহরের কবরস্থানগুলো বছরে একবার সূরা-কেরাত পড়া হয় না। কেউ মোনাজাত করতে আসে না। কিন্তু জামালপুরে কবরস্থানের পাশেই মসজিদ। সারাক্ষণই নামাজ পড়া হচ্ছে, আজান দেওয়া হচ্ছে, কোরআন পড়া হচ্ছে। ওখানে কবর দিলে শান্তিটা পাওয়া যাবে। আমি এটাই চাই।’
বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে পেরে আমাদের পরিবার প্রধানমন্ত্রী, চলচ্চিত্র পরিবার, নাট্য পরিবার ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষিদের কাছে কৃতজ্ঞ।
লেখক: আমজাদ হোসেনের পুত্র
