এক বছরে দশ রেকর্ড

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৬

বাংলাদেশের গর্ব কনক কর্মকার। গিনেস বুকে দেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী। ক্রীড়া নৈপুণ্য দিয়ে নোয়াখালীর এ তরুণ বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। একটি নয়, দশ-দশটি বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে গিনেস বুকে স্থান করে নিয়েছেন ২০ বছর বয়সী কনক। তা-ও আবার গত ১ বছরে। ২০১৯ সালে এক-দেড় মাসের ব্যবধানে তার এতগুলো বিশ্ব রেকর্ডের ঘটনায় সত্যিই বিস্মিত হতে হয়।

গত ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কনক কর্মকার এসেছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর নোয়াখালী অফিসে। সে আড্ডায় কনক শোনালেন তারা সাতরঙা নানা গল্প। কীভাবে ১ বছরে দশ রেকর্ড করলেন সে গল্পও শোনালেন তিনি—

শুরুর আগে শুরু!

নোয়াখালী অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে অন্য খেলার চেয়ে ফুটবলের জোঁকটা একটু বেশি। কনকও এর ব্যতিক্রম নন। আড্ডার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমি ফুটবল খেলাকে ভালোবাসতাম। ফুটবল খেলা দেখে ও খেলতে গিয়ে এক সময় ফুটবলকে ব্যালেন্সিং (নিয়ন্ত্রণ) করার চেষ্টায় থাকতাম। থুঁতনি, কপাল, হাঁটু ও মাথায় ফুটবল এবং বাস্কেট বলকে শূন্যে বসিয়ে, পায়ে টাচ করে ব্যালেন্সিংয়ের চেষ্টা করতাম। একইসঙ্গে কপালের ওপর চেয়ার, ডিম, প্লাস্টিকের কাপ ও ঘাস কাটার মেশিনসহ বিভিন্ন জিনিস রেখে ব্যালেন্সিংয়ের চেষ্টা করতাম। এভাবেই তৈরি হয় আমার ব্যালেন্সিংয়ের হাতেখড়ি।’

কনক যখন বিভিন্ন জিনিসপত্র জিহ্বা, ঠোঁট, মুখ ও কপাল দিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেন তখনই মাথায় আসে এটাতো আরো ভালোভাবে করা যায়। তাই ভালোভাবে ব্যালেন্সিং শেখার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যালেন্সিং সংশ্লিষ্ট ভিডিওগুলো দেখতেন দিনরাত এক করে। কনক বলেন, ‘২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি ইউটিউব দেখে ব্যালেন্সিংয়ের প্রশিক্ষণ শুরু করি। ৮ মাস এভাবে ব্যালেন্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যালেন্সিং আমার আয়ত্তে আসে। যেমন কপালে লাগিয়ে শূন্যে স্থির রাখা হলো কাপ ব্যালান্সিং।’

শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ দিয়ে নানা জিনিস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যখন কনকের পুরোপুরি আয়ত্তে এলো তখনো কনকের মাথায় ছিল না গিনেস বুকেও যে নিজের নাম লেখানো সম্ভব। এক পর্যায়ে বিভিন্ন জিনিসপত্রের ওপর ব্যালেন্সিং দক্ষতা দেখে তার বন্ধুরা গিনেস বুকে প্রতিযোগিতা করার জন্য উত্সাহ প্রদান করেন। তখন গুগলে সার্চ দিয়ে গিনেস বুকের বিভিন্ন বিষয় দেখতে থাকেন তিনি। তারপরই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন কনক। পরের গল্পটা? চলুন গল্পটি শুনি তার মুখ থেকেই।

 

গিনেস বুকে কনক

আগেই জানিয়েছিলাম, ব্যালেন্সিং বেশ ভালো পারেন কনক। কপালে গ্লাস রেখে প্রথম রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। চেষ্টার ফল হিসেবে সেই স্বপ্নের দেখাও পেয়ে গেলেন। ৬০০ গ্লাস কপালে ১ মিনিট ৬ সেকেন্ড রেখে রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল ইতালির রক মারিওর ৫০০ গ্লাসের। প্রথম রেকর্ড নিয়ে কনক বলেন, ‘৫০০ যখন হলো ভাবলাম ৬০০ দিয়েও আমি পারবো। অনেক চেষ্টার ফলে সেটা পেরেছি।’

কনক আরো বলেন, ‘২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি গ্রিনেস বুকে এটি আমার প্রথম রেকর্ড। এর এক-দেড় মাস পর ১০ মিনিট কপালে গিটার রাখার রেকর্ড ভঙ্গ করে আমি ২৫ মিনিট কপালে গিটার রেখে দ্বিতীয় রেকর্ড ভঙ্গ করি। এর আরো ১ মাস পর গাঢ় থেকে বাস্কেট বল হাতে নেওয়ার রেকর্ড ছিল ১ মিনিটে ২৭টি বল। আমি ১ মিনিটে ৪৬টি বল গাঢ় থেকে হাতে নিয়ে তৃতীয় রেকর্ড গড়লাম।

থুঁতনিতে গিটার রাখার প্রতিযোগিতার পূর্বের রেকর্ড ছিল ৫ মিনিট। কনক থুঁতনিতে গিটার রাখার এ প্রতিযোগিতায় ১৫ মিনিট পর্যন্ত ব্যালেন্স করে চতুর্থ রেকর্ড গড়ে। এরও মাসখানেক পর আরেকটি রেকর্ড গড়েন কনক। ১৫টি ডিম হাতের পেছনে রেখে পূর্বের রেকর্ডটি ভঙ্গ করে পঞ্চম রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে রেকর্ড ছিলেন ১২টি ডিম।

পাঁচের পর দশ

কনক বলেন, ‘ষষ্ঠ রেকর্ডটি গড়ি ঘাস কাটার মেশিন থুঁতনিতে রেখে। এর পূর্বের রেকর্ড ছিল ৬ মিনিট ব্যালেন্সিং। আমি ৭ মিনিট পর্যন্ত মেশিন থুঁতনিতে রেখে পূর্বের রেকর্ড ভঙ্গ করি। এরপর ফুটবল হাঁটুতে রাখতে হবে। এ প্রতিযোগিতার পূর্বের রেকর্ড ছিল ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। আমি সেক্ষেত্রে হাঁটুতে ৪ মিনিট ৬ সেকেন্ড ফুটবল রেখে ব্যালেন্সিং করে সপ্তমবারের রেকর্ড গড়তে সক্ষম হই। অষ্টম প্রতিযোগিতায় চেয়ার থুঁতনিতে ধরে রাখতে হবে। এতে পূর্বের রেডর্ক ছিল ১০ মিনিট। আমি ৩৫ মিনিট থুঁতনির ওপর চেয়ার ব্যালেন্সিং করে অষ্টম রেকর্ড গড়ি।’

কনক আরো বলেন, ‘নবম প্রতিযোগিতায় ফুটবলকে হাঁটু দিয়ে টাচ করে ব্যালেন্সিং করতে হবে। এ প্রতিযোগিতায় পূর্বে ১ মিনিটে ১৫১ বার বল টাচ করার রেকর্ড ছিল। আমি ১ মিনিটে ১৬৩ বার টাচ করে নবম রেকর্ডের অধিকারী হই। সর্বশেষ পেন্সিল হাতের পেছনে ওঠাতে হবে। এ প্রতিযোগিতার সময় নির্ধারিত ছিল ৩০ সেকেন্ড। এই ৩০ সেকেন্ডে পূর্বের রেকর্ড ছিল ৩০টি পেন্সিল ওঠানোর রেকর্ড। কিন্তু ৩০ সেকেন্ডে ৪০টি পেন্সিল উঠিয়ে পূর্বের রেকর্ড ভঙ্গ করি এবং গ্রিনেস বুকে ১০ম বারের মতো নিজের নাম লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম হই।

কনক পড়েন ফেনীতে

কনক পড়েন ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পাওয়ার বিভাগে। চতুর্থ বিভাগের ছাত্র তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশিই এত রেকর্ড করেছেন তিনি। কনক কর্মকারের বাড়ি বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজিপুরে। চৌমুহনী কলেজ রোডের পাশে  মণ্ডল পাড়ার বাসায় মা শিল্পী কর্মকার ও ছোট বোন রিয়া কর্মকারকে নিয়ে থাকেন। বাবা বাবুল কর্মকার সৌদি প্রবাসী। কনক কর্মকারের জন্ম ১৯৯৯ সালে। ২০১৬ সালে বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এএসসি পাশ করেন।

কনক বলেন, ‘প্রথমদিকে আমি আমার পরিবার থেকে ব্যালেন্সিং চর্চা ও গ্রিনিস বুকে যোগাযোগ এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য কোনো ধরনের উত্সাহ পাইনি। কিন্তু আমার বন্ধু ও কয়েকজন বড়ভাই আমাকে ব্যালেন্সিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য উত্সাহিত করেছেন। গ্রিনিস বুকে প্রথম রেকর্ড গড়ার পর আমার পরিবার থেকে আমি সহযোগিতা পেতে থাকি। ২০১৮ সালের দিকে ওয়ালটন গ্রুপ আমাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে এবং আমাকে উত্সাহ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। এ ১০টি প্রতিযোগিতার ভিডিও ধারণে সহযোগিতা করেছিল। চৌমুহনী রামচন্দ্র দেবের সমাধি আশ্রমের পরিচালনা কমিটি। আমি গ্রিনিস বুকে পাঠানো সবগুলো প্রতিযোগিতার ভিডিও ধারণ করি এ আশ্রম প্রাঙ্গণে। গ্রিনিস বুক অব রেকর্ডের নিয়মানুযায়ী ভিডিও ধারণকালে দু’জন সাক্ষী এবং দু’জন টাইমকিপার উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম রেকর্ড গড়ার অনুভূতি সম্পর্কে কনক বলেন, ‘এ রেকর্ড গড়া তার কাছে স্বপ্ন মনে হয়েছিল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পরবর্তী ইভেন্টগুলোতে রেকর্ড গড়ার ক্ষেত্রে উত্সাহিত করে  আমাকে। আমি আগামীতে ফুটবল ব্যালেন্সিংয়ের ওপর আরো রেকর্ড গড়তে চাই। এ জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।’ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে আরো রেকর্ড গড়ে দেশের সুনাম বয়ে আনতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।