আত্মনির্ভরশীল হতে লোভনীয় বৃত্তি ছেড়ে দেন দীপক

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৮

বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজ পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বৃত্তি দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। এসব বৃত্তি লুফেও নেয় তারা। প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করে না অধিকাংশ শিক্ষার্থী। তবে এবার ভিন্ন কিছু করে দেখিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দীপক চন্দ্র বর্মণ। ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়ার সময়। মাসিক সাড়ে ৩ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া হতো ওই ফাউন্ডেশন থেকে। কিন্তু ১ বছর যেতে না যেতেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে সেই বৃত্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

আবেদন করে মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনকেও একটি চিঠি লেখেন দীপক। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আপনার ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া বৃত্তি আমার লেখাপড়ার পথকে সুগম করেছে। আমি উক্ত বৃত্তি না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরেই আমার ছন্দময় শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়তো। বর্তমানে আমি নিজের খরচ নিজে নির্বাহ করার সামর্থ্য অর্জন করতে পেরেছি। তাই আমার বৃত্তি বাতিল করে দেওয়ার অনুরোধ করছি।’

এমন উদ্যোগ কেন নিয়েছে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে তা জানতে চাওয়া হয় দীপকের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমি আত্মনির্ভরশীল হয়ে গেছি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অসংখ্য শিক্ষার্থী আছেন, যারা নিজের পড়াশোন চালানোর সক্ষমতা রাখে না। আর্থিক সমস্যার কারণে বন্ধ করে দিতে হয় পড়াশোনা। তাদের জন্য এ বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত। সেজন্য বৃত্তি ধরে রাখাটা আর নেওয়া উচিত বলে মনে করিনি।’ 

নিজের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিকে আমি জিপিএ-৫ পেলেও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৪.৬৭ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এ ফলাফলের জন্য আমি কোথাও আবেদন করতে পারিনি। মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে আমার পড়াশোনা চালানোর জন্য সাহায্য দেওয়া হয়। এটি আমার প্রথমবর্ষের পড়াশোনার ছন্দ ধরে রাখতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু যখন দেখলাম আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজের খরচ নিজে চালানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করেছি তখন এ বৃত্তির অন্য কারো জন্য অপেক্ষকৃত বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেছি।’

দীপকের বাবা ধনঞ্জয় বর্মন আর মা কাঞ্চন বালা। দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় দীপক। ছোটবেলা থেকে অভাবের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। ইটভাটার শ্রমিক বাবার পক্ষে দীপকের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন ছিল। দীপক বলেন, ‘উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর কোচিং করার জন্য যে পরিমাণ টাকা পয়সার প্রয়োজন তা আমার পরিবারের ছিল না। পরে একটি কোচিং সেন্টার আমাকে ঢাকা নিয়ে আসে। কোচিং সেন্টারটিই আমার চার মাসের যাবতীয় খরচ বহন করে। পরবর্তীতে তারাই যোগাযোগ করিয়ে দেয় মানুষ মানুষের জন্য ফাইন্ডেশনের সঙ্গে।’

তিনি বলেন, ‘সবসময় আমি চেয়েছি আত্মনির্ভরশীল হতে। নিজের আর্থিক দৈন্যতার জন্য এই একাডেমিক সাহায্য নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি আত্মনির্ভরশীল। দুটো টিউশন দিয়ে চলতে পারি। এখন আমার এ বৃত্তির প্রয়োজন নেই।’ 

দীপকের এমন উদ্যোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনোভাবও ইতিবাচক। মাঈন উদ্দিন নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দীপকের এ কাজ প্রশংসার যোগ্য। বৃত্তি পেয়ে সে বৃত্তি স্বচ্ছলতা আসায় ফিরিয়ে দেওয়ার নজির খুব বেশি নেই। সবাই টাকা হাতিয়ে নিতে চায়। কিন্তু তার উল্টোটা করে দেখিয়ে দিয়েছে, সবাই প্রশান্ত কুমার না। কেউ দীপকও হয়।’

এ ধরনের ঘটনার পর দীপকের কেমন অনুভূতি তা জানতে চাইলে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টা আমার কাছে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিষয়টা প্রচার হয়ে যাওয়ার পর দেখি মানুষ এটাকে ভালোবেসে নিচ্ছে। এখন নিজের কাছে অনেক ভালো মনে হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, ভালো কাজ করলে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়, শ্রদ্ধা পাওয়া যায়।’

দীপকের এমন উদ্যোগের বিষয়ে মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি চন্দ্র নাথের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাইকে একটা বার্তা পাঠানোর চেষ্টা সবসময় করি। সেটি হচ্ছে, মানুষ মানুষের জন্য। আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে তুমি অন্যের পাশে দাঁড়াও। অন্যকে সাহায্য করো। এভাবেই আমাদের সমাজ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাবে। দীপক আমাদের মেসেজটি পেয়েছিল এবং সে তার নৈতিকতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও যারা বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে বৃত্তি নেয় তারা তো এক প্রকার প্রতারণাই করছে। এসব দাতা সংস্থারা অন্যের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা সুবিধবঞ্চিত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার যদি কেড়ে নেয় কেউ তবে সে নৈতিকতা এবং সততার জায়গায় অপরাধী হয়ে থাকলো।’