ব্যতিক্রমী এক সফলতার গল

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৯

 

‘স্পোর্টস এজেন্ট’ বাক্যটির সঙ্গে হয়তো আমরা অনেকেই অপরিচিত। ‘এর কাজ ই বা কী?’ এই প্রশ্নই হয়তো বা চেপে বসেছে প্রথম পড়াতেই। সহজ ভাষায়, খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগস্থাপনকারী। বিশ্বজুড়ে খ্যাতিলাভ করা প্রত্যেক ক্রীড়া ব্যক্তিরই রয়েছে নিজস্ব এজেন্ট। যার মাধ্যমে একজন খেলোয়াড় মূলত নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকেন। একজন খেলোয়াড়ের ব্যবসায়িক এই দিকটি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশে অজানা না হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটই যেন অনেকটা অনুপস্থিতই উল্লেখ করা যায়। নেই বলে কী থাকবেই না? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই হয়তো বাংলাদেশে এই ব্যতিক্রমী পেশার জন্ম দেন। এই পেশাতেই নিজের ব্যতিক্রমী ক্যারিয়ার গড়ে তোলা একজন স্বপ্নবাজ ব্যতিক্রমী তরুণ পলাশ সকাল।

পলাশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকৌশল ও ব্যবসায় বিষয়ে। বস্ত্র প্রকৌশলে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ডুয়েট) থেকে। স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে। স্নাতক শেষ হওয়ার পরই যোগদান করেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কর্মের সঙ্গে পারিশ্রমিকটাও যেন মন্দ না। তবে কথা থেকেই যায় পারিশ্রমিকই কী সব? সকাল-বিকেল রুটিনমাফিক চাকরি জীবনের পলাশের মাথায়ও যেন বারবার কড়া নাড়ে এই বাক্য। সবকিছু ঠিক রেখেও যেন পারছিলেন না নিজেকে চাকরি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে। মন যে পড়েছিল অন্যদিকেই।

গল্পটা শুরু করতে যে ফিরে যেতে হবে পলাশের পূর্বের গল্পে, ছোটবেলা থেকেই নিজের পছন্দের তালিকায় ক্রিকেটকেই যেন সবর্দা রেখেছেন অন্যতম শীর্ষে। পড়াশোনার সঙ্গে সমানতালে মন রেখেছেন ক্রিকেটের ২২ গজের মাঠের খবরে। শেষমেশ বড় সিদ্ধান্তটার শুরুটা এখান থেকেই। ছোট থেকেই ক্রিকেটকে ভালোবাসা পলাশ নিজেকে গড়ে তুলতে পারেননি ক্রিকেটার পরিচয়ে। তাই বলে ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন এক ভিন্নতর স্বপ্ন বাস্তবায়নে। হঠাত্ একদিন কর্মস্থল থেকে ফিরে ঠিকই করে ফেললেন ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে জড়াবেন। তবে ভিন্ন পরিচয়ে সঙ্গে এদেশে জন্ম দেবেন নতুন পেশার। ঠিক করলেন জাতীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে স্পোর্টস এজেন্ট হিসেবে নতুন পরিচয় গড়ে তুলবেন নিজেকে। শুরুর গল্পটা ঠিক এভাবেই। নিজেকে এমন এক পেশায় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি যেখানে প্রতিটি ক্রিকেটারের নামের সঙ্গে স্পষ্টভাবে জড়িয়ে থাকবে নিজের নামটাও। দেশের বাইরের গণ্ডিতে এই পেশাটা পরিচিত হলেও তা আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুনই বলা যেতে পারে।

এই পেশার ভরসাটাই বা কী? সঙ্গে থাকে হাজারো প্রশ্ন। স্বাভাবিকভাবেই তা মানতে পারেননি পিতা শুক্কুর আলী ও মাতা আমেনা বেগম। ভালো পারিশ্রমিকের চাকরি ছেড়ে এই ঝুঁকির জীবনে পা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার পক্ষ থেকে যে বাঁধার শিকার হয়েছিলেন তা যেন স্পষ্ট বলে দেয় পলাশের কথায়। তবে নিজের লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকা কোনো ব্যক্তি তো আর থেমে থাকতে পারেন না। ঝুঁকি নিয়েই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করতে। পলাশের সবকিছুর পাশাপাশি আরেক পরিচয় একজন রেডিওকর্মী। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন কাজ করেন দেশের প্রথমসারির বেসরকারি একটি রেডিও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। নিজের অনুষ্ঠানেই একদিন আমন্ত্রণ জানালেন এক জাতীয় দলের ক্রিকেটারকে। অনুষ্ঠান শেষে তাকে জানিয়ে বসলেন নিজের এই ভিন্নতর পরিকল্পনা। তবে অন্য সবার মতোই সেই ক্রিকেটারও স্বাভাবিকভাবে তেমন একটা আশাবাদী ছিলেন না পলাশের পরিকল্পনা নিয়ে। তবু হাল ছাড়লেন না। সব অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার প্লে কমিউনিকেশন’।

এরপর শুরু হয় অন্য গল্প। শুরুতে অনেক ‘না’ শুনতে হলেও দমে যাননি। অপেক্ষায় ছিলেন প্রতিটি ‘না’-এর বিপরীত কথাটির আশায়। মাথা ঘামাননি আশেপাশের মানুষ কী বললো, না বললো নিয়ে। নিজেকে যেন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ভেতরের শক্তির সঙ্গে। ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’ ভাবসম্প্রসারণটি যেন পলাশের সঙ্গে মিলেছিল ক্ষণে ক্ষণে। অর্জন করেন আরো বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের আস্থা। শুরু করে দেন কাজ। সফলতাটাও যেন আসতে শুরু করে ধীরে ধীরে। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের সঙ্গে কাজ করছে পলাশের প্রতিষ্ঠান। শুরু করেছেন নতুন এক পেশার যাত্রা।

‘যেকোনো কিছুর শুরুটায় চ্যালেঞ্জিং হয়। আমি একটা প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে নতুন এমনকিছু করতে চাচ্ছিলাম, যেখানে ভবিষ্যত্ কী হবে জানা ছিল না। সেই সময় আমার পরিবার, সমাজ থেকেও সমর্থন পাইনি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি যাদেরকে নিয়ে কাজ করি তারাও প্রথমে আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। তবে আমি হাল ছাড়িনি। সবসময় বিশ্বাস করি সফলতা আসবেই।’—বলেন পলাশ।