পুতিন আসলে কী চান

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩৮

এম এ আলআমিন

 

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শেষ পর্যন্ত অন্যসব একনায়কদের দেখানো পথেই হাঁটলেন। ১৫ জানুয়ারি দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর পুতিন নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কর বিভাগের প্রধান মিখাইল মিশুস্তিনের (৫৩) নাম ঘোষণা করেন। পুতিনের এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পথ পরিষ্কার করা হিসেবে।

মেদভেদেভ পদত্যাগ করার আগে পুতিন দেশটির সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তাবদেন। এরপর মেদভেদেভসহ পুরো সরকার পদত্যাগ করে।জাতির উদ্দেশে দেয়া স্টেট অব দ্য ন্যাশন ভাষণে পুতিন বলেন, রাশিয়ায় বড়ো ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের নির্বাচনে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব দেন। এছাড়া সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য গণভোটেরও প্রস্তাব দেন। পুতিন অবশ্য গণভোটের কোনো তারিখ দেননি। তবে তিনি বলেছেন, সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ভোট হওয়া প্রয়োজন। সংবিধান অনুযায়ী রাশিয়ায় পরপর দুই মেয়াদের পর কেউ প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন না। ফলে ২০২৪ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুতিন বর্তমান সংবিধানের অধীনে আর রাশিয়ার নেতা থাকতে পারবেন না। তাই তিনি সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। সমালোচকরা বলছেন, অতীতের মতো সংবিধান সংশোধন করে ক্ষমতায় থাকতেই তিনি এই পরিবর্তন আনতে চান। এর আগে ২০০৮ সালে ক্ষমতা বর্ধিত করতে তিনি সংবিধান সংশোধন করেছিলেন।

পুতিন প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৯ সালে। ২০১২ ও ২০১৮ সালে তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট হন, তার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। ১৯৯৯ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলিসন তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনি তখন ততটা পরিচিত ছিলেন না। কয়েক মাস পর ইয়েলিসন  পুতিনকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। তারপর থেকে দুই দশক ধরে পুতিন দেশটি শাসন করছেন। ২০২৪ সালের পরেও তিনি ক্ষমতা ধরে রাখবেন সে বিষয়ে রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা রকম গুঞ্জন চলছে। মেয়াদ পূর্তির চার বছর আগেই তিনি ক্ষমতার পথ নিষ্কণ্টক করলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বড়ো রকম ঝুঁকি নিয়েছেন। কারণ বিরোধীরা দীর্ঘ মেয়াদে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করতে পারে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দিন ধরেই মন্থর গতিতে এগোচ্ছে। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে না পারলে সেটি বিরোধীদের পথে নামতে বিশেষভাবে উত্সাহ জোগাবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর রাশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন বরিস ইয়েলেিসন। তিনি অবশ্য নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে পারেননি। ২০২৪ সালের পর পুতিন সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি চান প্রেসিডেন্টের বর্তমান ক্ষমতা যেন প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের হাতে থাকে। অথবা তিনি স্টেট কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় থাকবেন। প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেয়ার জন্য ২০০০ সালে কাউন্সিলটি গঠিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে এর হাতে তেমন ক্ষমতা নেই। বিষয়টি অনেকটি কাজাখস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট নুর সুলতান নাজারবায়েভের সঙ্গে তুলনীয়। নাজারবায়েভ ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হয়েছেন। আজীবন তিনি ঐ পদে থাকবেন।

দেখা গেছে ১৯৪৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ৩৭ জন নিজেদের আজীবন ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করেছেন। এদের মধ্যে ১৪ জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। আরো লক্ষ করা গেছে, যেসব দেশে একনায়করা নির্বিঘ্নে বছরের বছরের পর ক্ষমতায় ছিলেন তাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কোনো কোনোটি একনায়ক শাসিত ছিল। এছাড়া দুই প্রতিবেশী একনায়কের মধ্যে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে বিশ্লেষকদের অনুমান সত্ত্বেও পুতিন অবশ্য চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসে থাকার জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন। এই ঘটনার কয়েক দিন পর তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়াকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যুগে ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।’ এর মধ্য দিয়ে সোভিয়েত যুগে রাষ্ট্রপ্রধানদের আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। সোভিয়েত নেতারা প্রায় সবাই আমৃত্যু ক্ষমতায় থেকেছেন।