শেয়ারবাজার সংকটের শেষ কোথায়?

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪২

ড. আর এম দেবনাথ

এই মুহূর্তের প্রশ্ন, শেয়ারবাজার ব্যাংকগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, নাকি ব্যাংকের বাজার শেয়ারবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে? আবার হতে পারে, একে অন্যকে প্রভাবিত/ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবর। খবরটির শিরোনাম ‘শেয়ারবাজার পরিস্থিতি উত্তরণ জরুরি’। খবরটিকে  ঠিক এই মুহূর্তের শেয়ারবাজার ধসের কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, সংবাদটিতে কী করণীয় সেই সম্পর্কেও পথ দেখানো হয়েছে। প্রথম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শেয়ারবাজারের লিস্টিং সম্পর্কে। বলা হয়েছে, মৌল ভিত্তিহীন অনেক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আবার অনেক কোম্পানিকে প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা ছিল অনেক দিন। বর্তমানে এসব কোম্পানির শেয়ার ‘ফেইস ভ্যালু’র নিচে বিক্রি হচ্ছে। দ্বিতীয় যে কারণটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা হচ্ছে কোম্পানিতে সর্বনিম্ন শেয়ার ধারণের নিয়ম, অর্থাত্ কোম্পানিতে এর পরিচালকদের সর্বনিম্ন শেয়ার ধারণের কথা। তাদেরকে তা ধারণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। কীভাবে, তা পরে আলোচনা করব।

সংবাদটিতে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট আছে, আস্থার সংকট আছে, সর্বোপরি আছে ব্যবস্থাপনার সংকট। শেয়ারবাজারে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভালো শেয়ারে যারা বিনিয়োগ করেছেন তারা। আরো বলা হয়েছে ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ডের’ অভাবের কথা। রয়েছে ‘ফোর্সড সেলের’ কথা। মোট কথা সংক্ষিপ্ত এই রিপোর্টে শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। সব সমস্যা বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। একটা সমস্যা আলোচনা করতেই হয়। আমরা জানি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হচ্ছে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এসব কোম্পানি বাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করেছে। মালিকানা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু ব্যবস্থাপনা এদের পরিচালকবৃন্দের কাছে। শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষ থেকে কোম্পানির বোর্ড কোম্পানিটি  পরিচালনা করে। পরিচালকরা কিছু শেয়ারের মালিক। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শেয়ার থাকে/আছে। বাকি শেয়ার শেয়ারহোল্ডাদের হাতে। আর কিছু রাখা হয় ভবিষ্যতে বাজার থেকে টাকা/পুঁজি তোলার জন্য। এই কাঠামোর মধ্যে কয়েক বছর আগে দেখা গেল এক অভিনব খেলা। খেলাটি কী? কোম্পানির মালিকরা প্রভাবশালীদের যোগসাজশে শেয়ারের দাম বাড়াতে থাকেন। আজকে এক দাম তো কালকে আরো বেশি দাম। এভাবে বাজারে একটা বুদ্বুদের জন্ম দেওয়া হয়। মানুষ/বিনিয়োগকারীরা পাগলের মতো শেয়ারবাজারে নেমে পড়ে তাত্ক্ষণিক লাভের আশায়। আজকে কিনে কালকে বিক্রি করলেই প্রচুর ক্যাশ-মুনাফা হাতে পাওয়া যায়। টিউশনির টাকা, দুলাভাইয়ের টাকা, গরু-ছাগল বিক্রির টাকা, গয়না বিক্রির টাকা সব আসতে থাকে শেয়ারবাজারে। মতিঝিলে কোনো অফিসে কাজ করার লোক নেই। ব্যাংকের অফিসাররা কম্পিউটারের সামনে। তারা দেখছে শেয়ারবাজারের দাম। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তাই। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত সার্কুলার জারি করে শেয়ার ব্যবসা থেকে অফিসারদের বিরত থাকতে পরামর্শ দিল। কে কার কথা শোনে? তাত্ক্ষণিক মুনাফার আশায় মানুষ পাগল হয়ে পড়ে। এতে ইন্ধন জোগায় ব্যাংক। ব্যাংক তাদের টাকাপয়সা নিয়ে শেয়ারবাজারে নেমে পড়ে। এতে মদত জোগায় বাজে একটা নিয়ম। তখন নিয়ম ছিল আমানতের ১০ শতাংশ টাকা ব্যাংক শেয়ারবাজারে খাটাতে পারে। অথচ এই আইনটি হওয়ার কথা ছিল পরিশোধিত পুঁজির ১০০ শতাংশ। ভুল আইনের সুযোগে ব্যাংকের টাকা সমানে পুঁজিবাজারে আসতে থাকে। বাজারে অতিরিক্ত তারল্য দেখা দেয়। অথচ শেয়ার কম। ফলে শেয়ারের দাম ওঠে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এটাই ছিল কাটকাগজ কোম্পানি মালিকদের উদ্দেশ্য। প্রলোভন, প্রচারণা, প্রভাবশালীদের যোগসাজশে বাজার তখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তখন মালিকরা করলেন কী? তারা তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। এক টাকায় শেয়ার ১০-১৫ টাকা বিক্রি করে তারা বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেন। এক পর্যায়ে তাদের বিক্রি বন্ধ। বাজারে নামে ধস। এসবের ফল কী? ঐ মালিকদের ব্যাংকে ঋণ ছিল। তারা কি শেয়ারবাজার থেকে তোলা পুঁজি দিয়ে ব্যাংকের দেনা শোধ করেছেন? না, তা তারা করেননি। বিপরীতে কী ঘটল? দেখা গেল মালিকদের অধিকাংশই তাদের সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে ‘দিগম্বর মালিকে’ পরিণত হয়েছেন। অর্থাত্ তিনি কোম্পানির পরিচালক, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়াম্যান। কিন্তু কোম্পানিতে তার কোনো শেয়ারই নেই। ভাবা যায়, একজন পরিচালক কোম্পানি চলাচ্ছেন, তিনি কোম্পানির কথিত মালিকপক্ষ অথচ তার কোনো শেয়ার নেই কোম্পানির। কত বড়ো অন্যায় কাজ! যার কোনো শেয়ার নেই তার কোম্পানিতে দরদ থাকবে কীভাবে? অথচ এটিই হচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবত্ বিপুলসংখ্যক কোম্পানির পরিচালক ‘দিগম্বর পরিচালক’ হিসেবেই আছেন। অথচ ধস রুখতে নিয়ম করা হয়েছিল প্রত্যেক পরিচালককে এককভাবে কোম্পানির ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হবে এবং পরিচালকদেরকে সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হবে। তা তারা হননি। এমতাবস্থায় সিকিউরিটি একচেঞ্জ কমিশন থেকে বলা হয়, অবিলম্বে এই বিধান কার্যকর করতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্ট বলা হয়েছে, সেই থেকে সংকটের শুরু। মালিকদের শেয়ার কিনতে হবে, অতএব তারা এখন দল বেঁধে শেয়ারের দাম কমাচ্ছেন। আগের ঘটনা ছিল ভিন্ন রকম। তাদের টাকার দরকার। অতএব শেয়ারের দাম তারা আকাশচুম্বী করে টাকা লুট করেন। এবার শেয়ার কিনতে হবে। নিয়মের অধীনে থাকার জন্য প্রত্যেক পরিচালককে মোট পরিচালিত মূলধনের ২ শতাংশ শেয়ার কিনতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ। এর জন্যই তারা শেয়ারের দাম কমাচ্ছেন। বোঝা যাচ্ছে, কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী কোম্পানির মালিকরা যখন যা ইচ্ছা তা-ই করে চলেছেন। এর শেষ কোথায়?

অনেক সমাধানের মধ্যে ইত্তেফাকের রিপোর্টে একটি সমাধানের ইঙ্গিত আছে। বলা হয়েছে সিকিউরিটি একচেঞ্জ কমিশনে যারা বর্তমানে অধিষ্ঠিত, তাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অতএব এতে পরিবর্তন দরকার। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব, সরকার না চাইলে? সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি দৈনিকের সঙ্গে এক ইন্টারভিউতে বলেছেন, তিনি ‘সিকিউরিটি একচেঞ্জ কমিশনে’ পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন (১৯-১-২০)। তার কথা ‘তাকে শেষবার নিয়োগ দিতে চাইনি। কারণ বিধির বাইরে যেতে চাইনি আমি। সেই বিধি ভাঙা হলো আর আমিও তা গ্রহণ করলাম।’ তাকে বলতে কাকে বুঝিয়েছেন তার কথা আমি আর উল্লেখ করলাম না। বোঝা যাচ্ছে, সাবেক অর্থমন্ত্রীর আরেকটি কথার সারমর্ম। তিনি ক্ষমতায় থাকতে বলেছিলেন, সরকারের ভেতরেও সরকার আছে। এখানেই সমস্যা। অথচ আলোচ্য রিপোর্টটির ভাষ্যমতে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা দরকার শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে। এটা সম্ভব কী?

n লেখক :অর্থনীতিবিদ; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়