l সুমন্ত গুপ্ত
কর্মব্যস্ত জীবন যখন হাজারো কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠে, তখন একটু আরামের স্বাদ নিতে মন চাইতেই পারে। সবুজের বুকে, সমুদ্রের ঢেউয়ে কিংবা উড়ে বেড়াতে চাইবে পাহাড়ের বুকে চেপে মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াতে। আর সেই কর্ম ক্লান্তি দূর করতে আমরা এলাম কক্সবাজারে। আজ কক্সবাজার ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। সকালে পেটপূজা শেষ করে আমরা বেরোলাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে। আছি লোহাগড়া নামক স্থানে, মসৃণ মহাসড়ক পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। পথে দেখলাম—চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বন্য হাতি চলাচলের পথ। দেখে একটু থমকে গেলাম। আমাদের চার চাকার পাইলট পলাশ ভাইকে বললাম, ‘নতুন গন্তব্যে যাওয়ার আগে এই বনে ঘুরে যাই। যদি বন্য হাতির দলের দেখা পাই।’ সূর্যদেবের প্রখরতা তখনো বাড়েনি। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। সঙ্গী হলো সানন্দা আর অনিক। হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, এই ফাঁকে এই অভয়ারণ্য সম্পর্কে ইন্টারনেট থেকে কিছু জেনে নেওয়া যাক। চট্টগ্রাম জেলার লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থিত চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশেই এর অবস্থান। ১৯৮৬ সালে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চকরিয়া এলাকার সাতটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ১৯ হাজার ১৭৭ একর জায়গা নিয়ে ঘোষণা করা হয় চুনতি সংরক্ষিত এলাকা। এটি প্রধানত ক্রান্তীয় মিশ্র-চিরহরিত্ বনভূমি, যা হালকা থেকে খাড়া ঢালবিশিষ্ট পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত গর্জন বেল্টের অন্তর্গত। প্রায় ৪৭৭ প্রজাতির বারো লাখেরও বেশি গাছ ছিল এ বনে, যার মধ্যে প্রায় ১৫ প্রজাতির গাছ ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। এ বনে রয়েছে বেশ কিছু শতবর্ষী গর্জন গাছ। এছাড়াও শাল, সেগুন, আকাশমণি, গর্জন, বট, হারগোজা, চাঁপালিশ, হরিতকি, বহেরা, বাঁশ, আসাম লতা, ছন প্রভৃতি উদ্ভিদ বেশি দেখা যায়। এ বনাঞ্চলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাণী এশীয় হাতি। বন্য হাতিসহ নানা প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এ বনে সাধারণত লালমুখো বানর, মুখপোড়া হনুমান, খেঁকশিয়াল, সজারু, মায়া হরিণ, বন্য শুকর, শিয়াল, নানা রকম গিরগিটি, সাম্বারসহ অন্যান্য প্রাণী দেখা যায়। এছাড়া এ বনের সাপের মধ্যে কালান্তর, দাঁড়াশ, গোখরা, অজগর, লাউডগা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নানান জাতের পাখিরও অভয়াশ্রম এ বনাঞ্চল। এ বনের উল্লেখযোগ্য পাখি হলো বন মোরগ, লাল মৌটুসি, নীলকণ্ঠী, পাহাড়ি ময়না, মথুরা, ঘুঘু, ফিঙে, কাঠঠোকরা, ধনেশ, টিয়া, বুলবুলি ইত্যাদি। এ বনাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্গঠন স্থান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৮৬ সালে সাত হাজার ৭৬৪ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি নিয়ে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বাঁধানো দেয়ালের এক পাশে প্রবেশ গেট। প্রবেশ পথের পাশেই টিকিট কাউন্টার। কিন্তু সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম না। মনে হলো, খুব একটা জনমানবের পা পড়ে না হয়তো এখানে। প্রবেশ দ্বার পেরিয়েই শুরু হয়েছে বন। দূর থেকে দেখা পেলাম পাহাড়ের। ঝিঝি পোকার ক্লান্তিহীন ডাক এক অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। চলতি পথে আগন্তুকের মতো উপস্থিত হলেন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ। তার কাঁধে জ্বালানি কাঠ বোঝাই। বনের ভেতর থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে ফিরছেন বাসার পথে। তাকে বললাম, ‘আমরা এসেছি অনেক দূর থেকে। এখানের পথ চিনি না, যদি একটু সাহায্য করতেন ঘুরে দেখার জন্য।’ আমার কথা শুনে তিনি এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। চারপাশের অরণ্যে ভরপুর সবুজ। বেশ ভালোই লাগছিল শহরের যান্ত্রিকতামুক্ত পরিবেশ। বিশাল বিশাল সব গর্জন গাছ আকাশের মেঘের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। আমাদের পথপ্রদর্শক জানালেন, এশীয় হাতি এই বনের অন্যতম অলংকার। সচরাচর দেখা যায় না এদের। হাতির চলার পথে সাবধানে হাঁটার নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। তিনি আরো জানালেন এখানকার হাতির দল মিয়ানমার পর্যন্ত চলাফেরা করে অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে। বনটি হাতি চলাচলের অন্যতম করিডর। এখানে গর্জন ছাড়াও দেখলাম নানা জাতের পাহাড়ি গাছপালার। দেখতে দেখতে কীভাবে যে একটি ঘণ্টা পার করে দিলাম টেরই পেলাম না। বলে রাখা ভালো, চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতরে আছে তিনটি পায়ে হাঁটা পথ বা ট্রেইল। ছোট, মাঝারি ও বড়ো পথ তিনটিতে হাইকিং করা যাবে যথাক্রমে আধ ঘণ্টা, ১ ঘণ্টা ও ৩ ঘণ্টা হিসেবে। এসব পথে দেখা মিলতে পারে বন্য হাতিসহ নানা বন্যপ্রাণীর। চমত্কার এই পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মন চাইবে হারিয়ে যেতে। অভয়ারণ্য এলাকায় বনপুকুর, প্রাকৃতিক গর্জন বনাঞ্চল, এশীয় বন্য হাতির বিচরণ ক্ষেত্র, গয়ালমারা প্রাকৃতিক হ্রদ, বনপুকুর ফুটট্রেইল, জাঙ্গালিয়া ফুটট্রেইল, গোলঘর, স্টুডেন্ট ডরমিটরি, নেচার কনজারভেশন সেন্টার, গবেষণা কেন্দ্র, ইকো-কর্টেজসহ বিভিন্ন ইকো-ট্যুরিজম স্থাপন করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য।
যা ও য়া র উ পা য়
ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, সায়দাবাদ ইত্যাদি জায়গা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে নামতে হবে লোহাগড়া বাজার বাস স্টেশনে। ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বিভিন্ন এসি ও ননএসি বাস সার্ভিস রয়েছে। এদের মধ্যে সৌদিয়া, এস আলমের মার্সিডিজ বেঞ্জ, গ্রিন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন উল্লেখযোগ্য। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরপর বাজার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে চুনতি অভয়ারণ্যে যেতে হবে থ্রি হুইলারে। এছাড়া চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ও অক্সিজেন মোড় থেকেও কক্সবাজারের বাসে চড়ে লোহাগড়া নামতে পারেন। ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা।
